নাব্যতা সংকট দূর করতে ড্রেজিংয়ের দাবি

কাপ্তাই হ্রদে পানি বাড়ায় চার উপজেলার বাসিন্দাদের স্বস্তি

গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে কাপ্তাই হ্রদে পানি কিছুটা বেড়েছে। এতে আস্তে আস্তে উপজেলার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে পলি জমতে জমতে কাপ্তাইয়ের তলদেশ অগভীর হয়ে পড়ায় এই পানি বর্ষা মওসুমের পরে আর ধরে রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে আবারও সন্দিহান কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে চলাচল নির্ভর চার উপজেলার বাসিন্দারা।

কাপ্তাই হ্রদে বেড়েছে পানিকাপ্তাই হ্রদ দিয়েই জেলা শহরে চলাচল করতে হয় রাঙ্গামাটির বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু ও বিলাইছড়ির উপজেলার বাসিন্দাদের। এমন কয়েকজন স্থানীয় জানান, গ্রীষ্মের তাপদাহের কারণে কাপ্তাই হ্রদে দিন দিন পানি কমছিল। এতে জেলা সদরের সঙ্গে বেশ কয়েকটি উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে, অক্টোবর মাসের পরে তেমন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় হ্রদের রিজার্ভ (সংরক্ষিত) পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছাড়তে হয়েছে। আবার জলেভাসা জমিতে চাষাবাদের জন্যও হ্রদে প্রচুর পানি ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে চৈত্রের পর থেকেই পানি কমে যাওয়া ও হ্রদে প্রচুর পলি জমার কারণে রাঙামাটির সঙ্গে উপজেলাগুলোর নৌপথে যোগাযোগে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছিল। পণ্য পরিবহনসহ যাত্রীদের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয় এসময়। তারা জানান, কাপ্তাই হ্রদে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় এই দুর্ভোগের মাত্রা আরও বেড়েছে। অতিরিক্ত পলির কারণে পানি খানিকটা কমে গেলেই দুর্গম অঞ্চলে চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়।
গবেষকদের ভাষ্যমতে, পলি জমতে জমতে হ্রদটির গভীরতা বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে প্রায় চার মাসেরও অধিক সময় উপজেলাবাসীকে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয়। বিভিন্ন সময় কাপ্তাই হ্রদে ড্রেজিংয়ের কথা বলা হলেও এখনো কোনও সুসংবাদ পাচ্ছেন না জেলাবাসী।
জানা গেছে, প্রায় ৬৫ বছর আগে বাঁধ নির্মাণের সময় এখানকার বিশাল এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে লক্ষাধিক আদিবাসী ভূমি হারিয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বাঁধ দেওয়া হলেও পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বনজ সম্পদ আহরণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পানিপথ উন্নয়ন, নৌযোগাযোগ স্থাপন এবং মৎস্য উৎপাদনের বিষয়গুলো তখন থেকেই বিবেচনায় ছিল। হ্রদটির সৃষ্টি এ এলাকার লক্ষাধিক অধিবাসীর জন্য অভিশাপ বয়ে আনলেও এই হ্রদ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উম্মুক্ত করে দেয় নতুন এক সোনালী সম্ভাবনার দিগন্ত। পাশাপাশি নৌপথে কয়েকটি উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগও সহজ হয়। অপরূপ সৌন্দর্য্য ও নয়নাভিরাম হ্রদটি দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এই হ্রদ ঘিরেই পর্যটন খাত থেকে আয় হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু এই হ্রদ ব্যবস্থাপনার জন্য বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ে যেমন সুষ্ঠু কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি, তেমনি এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কোনও সমন্বিত উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
এর মাঝেই পাহাড়ি ঢলের কাদা মাটি, পলি মাটি, বিষাক্ত বর্জ্য, আবর্জনা ফেলে হ্রদটিকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী দু’দশকের মধ্যেই হ্রদটি আর কর্মোপযোগী থাকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে নৌপথে রাঙামাটির সাতটি উপজেলার সঙ্গে সদরের যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই, নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়িতে সড়কপথ থাকলেও বাকি চারটি উপজেলা বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু ও বিলাইছড়ির সঙ্গে সরাসরি নৌপথে আসা-যাওয়া করতে হয়। জুরাছড়িতে এখনো সরাসরি কোনো লঞ্চ বা বোট যেতে না পারলেও পানি বৃদ্ধিতে কমে আসছে দূরত্ব। এছাড়া বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়িসহ অন্যান্য উপজেলায় নৌ-যোগাযোগ আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কাপ্তাই হ্রদে স্বাভাবিক যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য আরও প্রচুর পানি প্রয়োজন রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ নিধন, জুমচাষের ঐতিহ্যবাহী পন্থা পরিহার করে যেভাবে ইচ্ছা পাহাড় কর্ষণ ও চাষ এবং পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কাপ্তাই হ্রদের ওপর। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানবসৃষ্ট কারণগুলোকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করেছেন তারা।
হ্রদ এলাকার শহর ও বাজারে স্থাপিত স’মিল, ফিলিং স্টেশন, জেটি ঘাট, বাস-ট্রাক টার্মিনাল এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ আবাসিক এলাকার বর্জ্য ও আবর্জনা হ্রদে ফেলা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে পলির মাত্রাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে এলাকার চাষাবাদ, মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। নৌচলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে।
লঞ্চচালক ও যাত্রীরা জানান, প্রতিবছর চৈত্র থেকে আষাঢ় পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির অভাবে প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জেলার উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ ও নির্বিঘ্ন রাখার জন্য যে উদ্যোগ তা চোখে পড়ছে না। জনপ্রতিনিধিরা কাপ্তাই হ্রদে দ্রুত ড্রেজিং শুরুর আশ্বাস দিলেও এর কোনও কার্যক্রম চোখে না পড়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন ভুক্তভোগীরা।
আরও পড়ুন: রিমান্ডে থাকা ফাইজুল্লাহ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

                ‘বন্দুক, তুমি যুদ্ধ বোঝো, তদন্ত বোঝো না’

                সরকারের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে পড়ার ভয়ে ক্রসফায়ার: খালেদা জিয়া

/টিএন/আপ-এমও/