অতিথি ঘরে বাবার স্মৃতি মন্থর করতে গিয়ে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বলেন, ‘রোজা শুরু’র পর থেকে আমাদের মার্কেটে যাওয়া-আসা করতে থাকি। আর ঈদের জন্য পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন সামগ্রী কিনে নিয়ে আসি। কিন্তু এবার রোজা পর থেকে একদিনও রাজশাহীর মার্কেটে যাওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমরা কেউ ঈদের কোনও পোশাক কিনিনি। তবে আত্মীয়-স্বজন আমাদেরকে দিয়েছে। এবার বাবাকে ছাড়া ঈদ করতে হবে ভাবতেই অবাক লাগচ্ছে। আমার বাবার স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হলে তা না হয় মানা যায়। কিন্তু যেখানে সবাই বলে একজন ‘ভালো’ মানুষ। তাকে কেন? এভাবে না ফেরার দেশে চলে যেতে হবে!
বাবার সঙ্গে ঈদের স্মৃতি মন্থর করতে গিয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বলেন, ঈদের জন্য বাবা রোজার আগেই আমাকে ও ভাইকে (রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ) টাকা দিয়ে দিতেন। কিন্তু ঈদের পাঁচ দিন আগে বাবা আমাদের বলতেন, কোথায় তোমাদের ঈদের কেনাকাটা। আমরা খুশি হয়ে বাবাকে দেখাতাম। তখন বাবা বলতো তোদের পোশাকটা খুব ভালো হয়নি। তখন বাবাকে বলতাম তুমি আগের যুগেই থেকে গেলে। এবার ঈদে বাবাকে তা বলতে পারলাম না।
শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকী ঈদের দিন বাড়ি থেকে তেমন বের হতেন না। খুব ভোরে উঠে মেয়ে শতভিকে উঠাতেন। কিন্তু শতভি ঘুম থেকে উঠতেন না। তখন রেজাউল করিম বলতেন, ঈদের দিন কেউ দেরি করে ঘুম থেকে উঠে? তাড়াতাড়ি উঠে নতুন পোশাক পরে তৈরি হাও। আর একমাত্র ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভকে নিয়ে ঈদের ময়দানে বের হতেন তিনি। ময়দান থেকে ফিরে এসে স্ত্রী কি রান্না করছেন তা দেখে আসতেন। শুধু তাই নয়, রান্না কেমন হয়েছে, তাও পরীক্ষা করতেন। তারপর সেতার বাজাতেন, বই পড়তেন। আর ঈদের দিন রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাতেন। সন্ধ্যায় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদেরকে নিয়ে চলতো আড্ডা। এই আড্ডায় তিনি থাকতেন মধ্যমনি। মুসকি মুসকি হাসতেন। আর ছোট-বড় সবার সঙ্গে উৎসবের আমেজটা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
শিক্ষক রেজাউলের ছোট ভাই সাজেদুল করিম সিদ্দিকী এবার বড় ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গেই ঈদ করবেন। তিনি বলেন, অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। কিন্তু বলতে গিয়ে আর বের হয় না। কারণ ভাই আমাদের ছিলেন অভিভাবক। যখন যা প্রয়োজন তা আমাদের বুঝতে দেয়নি। তিনি চেষ্টা করেছেন, যেন আমরা কোনও কিছুর অভাব না পায়। কিন্তু তার শূন্যতা নিয়ে আমাদেরকে এবার ঈদ করতে হবে।’
রেজাউল হক সিদ্দিকীর পরিবারের দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, তারা এই মামলাটা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছেন। যেন প্রকৃত অপরাধীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পায়।
গত ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজ বাসার সামনে থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে। এ ঘটনায় নিহত শিক্ষকের ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় পুলিশ এক জেএমবি সদস্যসহ মোট ৯ জনকে আটক করেছে।
/এসএনএইচ/