কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার

এসএম সামছুর রহমান, বাগেরহাট
০৪ জুন ২০২৬, ২০:৫৬আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ২০:৫৬

একদিকে আট বছরের শিশু কন্যা ফাতেমাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে সামনে এলো এমন মানবিক গল্প, যা ছুঁয়ে গেছে অনেকের হৃদয়। কুমিরের আক্রমণে শিশুর মৃত্যুর পর মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে খুঁজে পেলা পরিবার।

সাড়ে তিন বছর আগে ছোট্ট ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান মা ফজিলা খাতুন। ময়মনসিংহ থেকে ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে চলে আসেন বাগেরহাটে। ওদিকে পরিবারের লোকজন সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও তাদের আর পাননি। একপর্যায়ে তাদের খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয় পরিবারটি। অবশেষে ফজিলাকে পেয়ে ভাই হারেস আলী (৩৮) বলেন, ‘হে আমার বড় বইন। ছোডোকাল দেই হে (ফজিলা) এট্টু হওজ (বোকাসোকা) আছিল। তয় বাড়ি থেইক্কা আসার প্রায় পাঁচ বছর আগ দে একদম পাগল অবস্থা (মানসিক ভারসাম্যহীন)।’

এক বছরের বেশি সময় ধরে ফজিলা খাতুন তার মেয়ে ফাতেমা খাতুনকে নিয়ে থাকতেন বাগেরহাটের হজরত খান জাহান (রহ.)-এর মাজার এলাকায়। তবে কেউ জানতেন না ফজিলার নাম। সবার কাছে তার পরিচয় ছিল, ফাতেমার মা ও মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে। গত সোমবার রাতে মাজারসংলগ্ন দিঘির কুমির টেনে নিয়ে যায় শিশু ফাতেমাকে। একদিন পর মঙ্গলবার ভোরে দিঘিতে লাশ মেলে শিশুটির। এদিন দুপুরে মাজার প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে দিঘির পাড়ে দাফন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ওই কুমির।

দিঘিতে শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশ পায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব খবর ও ভিডিও নজরে পড়ে ময়মনসিংহে থাকা ফজিলার পরিবারের চোখে। তারা ছবি দেখে নিশ্চিত হন নিহত ছোট্ট ফাতেমা ও তার মা তাদের পরিবারেরই সদস্য। খোঁজ পাওয়া যায় ফজিলা খাতুনের। এরপর ওই দিনই ময়মনসিংহ থেকে পরিবারের সদস্যরা ফাতেমাকে নিতে রওনা হন বাগেরহাটের উদ্দেশে। ফজিলার মা হাজেরা খাতুন, ভাই হারেছ আলী, ভাই জুয়েল মিয়া, ছেলে বজলুর রহমানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বাগেরহাটে ছুটে আসেন। মাজারে এসে তারা ফজিলাকে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সন্তান মৃত্যুর তিন দিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খান ফজিলা। পরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দুপুরে ফজিলাকে গ্রহণ করেন তার ভাই হারেছ আলী।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর হরিচাঁদ গ্রামে ফজিলা খাতুনের বাড়ি। প্রায় ২৮ বছর আগে পার্শ্ববর্তী চর খরিচা গ্রামের মমরুজ আলীর সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে কুমিরের আক্রমণে নিহত ফাতেমা খাতুন ছিল সবার ছোট।

কুমিরের আক্রমণে নিহত শিশু ফাতেমার মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে উপজেলা প্রশাসন

মাকে নিতে বৃহস্পতিবার নানি, মামা, খালুদের সঙ্গে বাগেরহাটে এসেছিল ফজিলার তৃতীয় সন্তান বজলুর রহমান (১৪)। তিন বছরের বেশি সময় পর মায়ের দেখা পাওয়া বজলুর বলে, ‘ফাতেমা আমার বোন। মোবাইলে খবর দেইখ্যা আমরা এই হানে আসছি।’

ফজিলার ভাই পেশায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী হারেজ আলী জানান, ফাতেমার জন্মের আগে থেকে তার বোন বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তখন থেকেই ফজিলা বাবার বাড়িতে থাকতেন। ফাতেমার জন্ম ও নিখোঁজের আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। 

হারেস আলী বলেন, ‘একদিন ঝড়তুফান ও বৃষ্টির মাঝে আমার বোন মাইয়াডারে নিয়া বাড়ি তে বের হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম, কোনও হানে পাই নাই। নিউজটা মোবাইলে দেইখা আমরা আইছি।’

ফজিলাকে নিতে তার এক ছেলে, মা, দুই ভাই, চাচা ও চাচাতো বোনের স্বামী—মোট ছয় জন এসেছিলেন বাগেরহাটে। তাদের ভাষ্য, ফজিলা তাদের চিনেছেন। ফাতেমাকে কুমিরে টেনে নেওয়ার কথাও বলেছেন।

হারেস আলী বলেন, ‘সকালে এসে দেখি মাজারের পূর্ব পাশে একটা ঘরের সঙ্গে ঠ্যাস দিয়ে শুয়ে আছে আমার বোন। আমারে দেখে হাট করে উঠে বসে। পরে তাকে (বোন) নিয়ে ফাতেমার কবরের কাছে গেছি। দিঘির চারপাশ থেকে ঘুরছি। আমারে বলে, “আমার ফাতেমা আমার কাছে নাই। আমার বাচ্চারে কুমিরে খাই হ্যালছে, কুমিরে আমারে খাইয়া হ্যালাক। আমি যাইতাম না।”’

ফজিলার মা হাজেরা খাতুন বলেন, ‘সারা রাইত বাসে, ভোরে মাজারে আইছি। আমার ছয় জনের (সন্তান) মাঝে ফজিলা বড়। আমারে দেইখা কয়, “আমার মেয়ে না দিলে আমি যাইতাম না। আমার মেয়ে হাত উঠায় ডাকছে আম্মা আম্মা করছে।” ফজিলা কান্তে পারে না, হেই শক্তি নাই। আমরা ওরে বাড়ি নিয়া যাইতে আইছি।’

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা ফজিলার জাতীয় পরিচয়পত্র, নিহত ফাতেমার টিকা কার্ডসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সমাজসেবা, মহিলা অধিদফতর ও পুলিশের উপস্থিতিতে জিম্মানামায় সই করিয়ে ফজিলাকে তার ভাইয়ের জিম্মায় দেওয়া হয়।

বাগেরহাট সদরের ইউএনও আতিয়া খাতুন বলেন, ‘মাজারে কুমিরের আক্রমণে মারা যাওয়া ফাতেমার মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে নেওয়ার জন্য তার মা-ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা আসেন। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াও আমরা ময়মনসিংহে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ ওই এলাকায়ও কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। সবকিছু যাচাই করে আমরা ওই নারীকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
সর্বশেষ খবর
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি