ইতোমধ্যে গ্রামের বিস্তৃর্ণ এলাকা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। ফলে অনেক পরিবার এখন ভিটে মাটি ছাড়া। এলাকাবাসী জানান, জমি, সহায়-সম্বল, ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। কেউ পাগল প্রায় আবার কেউ কেউ ভিটে বাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গত ১৪ বছরে এখানকার বহু মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটা হারিয়ে গ্রামছাড়া হয়েছেন। আর এখনও যারা গ্রামে রয়েছেন, তাদের যেকোনও সময় ভিটে হারানোর আশঙ্কায় থাকতে হয়।
এক সপ্তাহ ধরে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে গ্রামটিতে। এলাকার একমাত্র সাহেবের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বন্যার্তদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নদের পানিতে আগেই চলে গেছে স্কুলের টয়লেট। পশ্চিম দিকে দেখা দিয়েছে ফাটল। শিক্ষকরা এ ভবনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে সাহস পাচ্ছেন না। বুধবার থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালির বস্তা ফেলে বিদ্যালয়টি রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এলাকাবাসী বলছে, কেবল স্কুল নয়, মানুষের বসতবাড়ি, জমিজমা রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব। এলাকায় মানুষ না থাকলে স্কুল দিয়ে কী হবে! এখানে পড়বে কারা!
সম্প্রতি সাহেবেরচর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভাঙনে বিলীন হওয়ার দৃশ্য, ব্রহ্মপুত্র নদটি বাঁক নিয়ে গ্রামের ভেতরে ঢুকে গেছে। স্থানীয়রা মনে করছে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কিছুদিনের মধ্যে দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে গ্রামটি। তারা জানান, গ্রাম থেকে দুই কিলোমিটার দূরে থাকা নদটি ধীরে ধীরে গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. সিরাজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ব্রহ্মপুত্রের দুর্যোগ গ্রামের ধনী-গরিব সবাইকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। তাদের বাড়ি ও জমি এখন ব্রহ্মপুত্রের পেটে। যার শত কাঠা জমি ছিল, তিনিও আজ ভূমিহীন। এক সময়ের সচ্ছল কৃষক কামলা খাটে, নৌকা চালায়। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে শহরে গিয়ে রিকশা চালাচ্ছে। কেউ আবার পরিবার পরিজন নিয়ে ইটভাটার শ্রমিক।
নদের ভাঙন থেকে বসতঘর রক্ষা করতে তিনবার সরিয়েও এলাকার মোক্তার উদ্দিন ও আমেনা আক্তার শেষ রক্ষা পাননি। নিরুপায় হয়ে তার এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই জায়গা না পেয়ে সরকারি রাস্তায়ও আশ্রয় নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী রিয়াজ উদ্দিন জানান, তাদের ৪০ কাঠা জমি ছিল। সবই চলে গেছে ব্রহ্মপুত্রের পেটে। এখন তিনি অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ গ্রামের রবি মিয়া, নুরুল ইসলাম, জুয়েল মিয়া, বাক্কার মিয়া, বাহার উদ্দিন, নাজিম উদ্দিন, আল-আমিন, মুকসুদ মিয়া, হাবিুবর রহমানের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে। ওরা এখন প্রতিবেশী ও স্বজনদের জায়গায় ছোট ঘর তুলে বসবাস করছেন। এছাড়া, ভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা নদীতে চলে যাওয়ায় জলিল মিয়া, স্বপন মিয়া ও শাহজাহান মিয়া এলাকা ছেড়ে পাশের ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও এলাকায় বসতি গড়েছেন।
এলাকাবাসী জানান, গত এক সপ্তাহ থেকে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে এটা অব্যাহত থাকলে সাহেবের চর গ্রামের কমপক্ষে দুই হাজার বাড়ি হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি।
সাহেবেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. রফিকুল আলম জানান, ২০০৮ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি ব্রহ্মপুত্রের পানিতে তলিয়ে যায়। পরে এলাকার বন্যার্তদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রটিকে বিদ্যালয় হিসেবে চালানো হচ্ছে। গত বছর এটির টয়লেট নদীগর্ভে চলে যায়। পরে টিনের একটি টয়লেট দিয়ে ২২৪ শিক্ষার্থীর এই স্কুলটিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে এখন আবার চরম হুমকির মুখে আছে স্কুলটি। তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি নিয়ে চালানো হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। কোনও কোনও সময় বিদ্যালয়ের মাঠেও করানো হয় ক্লাস।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ব্রহ্মপুত্রের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে নদের দুকূল ছাপিয়ে পানি এ গ্রামটিতে আঘাত করে। তীব্র স্রোতে ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ কারণে দীর্ঘদিন গ্রামটি ভাঙছে। গ্রামটি রক্ষায় একটি জরুরী প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বালির বস্তা ফেলে বিদ্যালয়টি রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। এলাকার অনেক পরিবারের ঘরবাড়ি চরম হুমকির মুখে। বহু পরিবার এরই মধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়ে এলাকাছাড়া। গ্রামটিই এখন ছোট হয়ে আসছে। গ্রামটি রক্ষায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধের জরুরী প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর অনুমোদন পেলে গ্রামটির কিছু অংশ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
/এসএনএইচ/