সেই দুই শিশুবীর

রেললাইনের ওপরে স্কুলব্যাগ কাঁধে দুই বন্ধুশিহাব ও লিটন দুই বন্ধু। এক সঙ্গে স্কুলে যায়, আবার একসঙ্গে বেশিরভাগ সময় খেলাধুলা করে তারা।  বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করে রেললাইনের পাশে। শীতের সকালে অন্যদিনের মতো সোমবারও (১৮ ডিসেম্বর) রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানি স্টেশন থেকে পূর্ব দিকে রেললাইনে ধরে খেলতে যায় দুই বন্ধু।  ৪০০ গজ দূরে গিয়ে দেখে রেললাইনের কিছু অংশ ভাঙা। এনিয়ে দুজনের মধ্যে ছোটাছুটি। বাড়ি থেকে একটি লাল রংয়ের মাফলার নিয়ে এসে রেললাইনের ওপরে দাঁড়িয়ে যায় দুই বন্ধু শিহাব ও লিটন। এভাবেই এই দুই শিশুর উপস্থিত বুদ্ধিতেই ইঞ্জিনসহ ৩১টি ওয়াগনবাহী ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পায়।

ঝিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র শিহাব ও লিটনের বীরত্বগাথার গল্প এখন সবার মুখে মুখে।  ঠিকমতো এখনও গুছিয়ে কথা বলতে না পারা এই দুই শিশুর মেধা,সাহস ও বুদ্ধির প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে।

এই মাফলারটিই সেদিন তুলে ধরেছিল শিহাব ও লিটনলাল জিনিস দেখালে ট্রেন দাঁড়িয়ে যায়। এমন বুদ্ধিটা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মাথায় কিভাবে এলো। এমন প্রশ্নে শিহাবুল ইসলাম শিহাব বলে, ‘আমরা রেল লাইনের ধারে খেলাধুলা করি। যখন ট্রেন চলে না তখন রেললাইন মেরামত করার জন্য কিছু মানুষ কাজ করে। তাদের হাতে লাল কাপড় থাকে। আর সেটা উঁচু করে দেখালে ট্রেন থেমে যায়। এই বুদ্ধিতে আমি বাড়ি থেকে লাল মাফলার নিয়ে এসে দুই বন্ধু মিলে ধরি।’

তারা যে জায়গায় এই সিগন্যাল দেখিয়ে ট্রেন থামিয়ে ছিল, তার থেকে একটু দূরেই ট্রেনের ক্রসিং পয়েন্ট। সেখানে দুটো ট্রেনের ক্রসিং হওয়ার কথা। এই পরিকল্পনায় পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন আড়ানি স্টেশনের পয়েটম্যান মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মালগাড়ি এসে ঘটনাস্থলে আগে ব্রেক করে। তখন অগ্রসর করার জন্য মালগাড়ির চালককে পতাকা দেখায়। এমন সময় একটি ছেলে এসে বলে গাড়ি যাবে না। রেললাইন ভেঙে গেছে। তখন দৌড়ে গিয়ে দেখি, রেললাইন ফাটল ধরে টুকরো হয়ে গেছে। এরপর স্টেশন মাস্টারকে ফোন দিই। তখন মাস্টার সাহেব ছুটে আসেন। এরপর আমরা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামতের ব্যবস্থা করে পুনরায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করি।’

লিটন ও শিহাব মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘ওই মাসুম দুইটা ছেলের প্রচণ্ড অবদান। তাদের জন্য দুর্ঘটনা থেকে ট্রেন রক্ষা পেয়েছে। ’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও শিশু দুইটির সঙ্গে কথা বলার পর বাঘা উপজেলার নির্বাহী অফিসার শাহিন রেজা বলেন, ‘আমাদের আড়ানি স্টেশনের পাশে শিহাব ও লিটন যে সহসিকতা দেখিয়েছে, আসলে তারা তাদের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। একটি তেলবাহী ট্রেন আসছে। আর তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মাথায় বুদ্ধিটা এসেছে কিভাবে ট্রেন থামানো যাবে। সত্যি কথা বলতে কী তারা তাদের মানসিকতা, বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে। আড়ানিসহ সারাদেশে এধরনের বাচ্চা রয়েছে। সঠিকভাবে পরিচর্চা করলে তারা সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন থেকে সোমবারই খোঁজ-খবর পেয়েছি। মন্ত্রী (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম) মহোদয় শিশু দুটির সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি তাদের শিক্ষা বৃত্তি ও তাদের মাসিক খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন। আড়ানির ইউপি চেয়ারম্যানও খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আমি সরেজমিনে এসে কথা বললাম। আমাদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশু দুইটিকে শিক্ষাসমাগ্রী ও তাদের বাবা-মায়ের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ করলাম।’  

ট্রেনচালক কেএম মহিউদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ‘দূর থেকে আমাদের চোখে লাল কিছু জিনিস মনে হয়েছে। এরপর আমার সহকারী চালকের সঙ্গে আলোচনার পর  ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করে চলতে থাকি, যাতে করে ট্রেনটি দাঁড় করানো যায়। এরপর পেছনে আমাদের গার্ডকে অবহিত করলে তিনি ট্রেন থামাতে বলেন। ট্রেন থেকে নেমে শিশু দুটিকে দেখি তারা লাল রংয়ের মাফলার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ’

শিহাবের বাবা কৃষক সুমন আলী বলেন, ‘‘আমি বাড়িতে ছিলাম। তখন আমার ছেলে বাড়ি এসে লাল কাপড় খোঁজাখুঁজি করে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, কী করবি।  সে বলে, ‘রেল লাইন ভেঙে গেছে। ট্রেন থামাতে হবে।’ একটি লাল রংয়ের মাফলার নিয়ে সে আবারও দৌড় দেয়। বিষয়টি আমি তেমন গুরুত্ব দেইনি। পরে যখন জানলাম, তখন ভাবলাম আমার ছেলে অনেক বড় কাজ করেছে। ’’

শিহাবের বাবা সুমন আলী ও মা রিতা বেগমের প্রত্যাশা, তাদের ছেলে যেন পড়ালেখা শিখে দেশে ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে।

লিটনের মা মিনুয়ারা বেগমেরও তার ছেলেকে নিয়ে একই রকম প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ‘আমি তখন রেললাইন অতিক্রম করছিলাম।  তারা আমার গায়ের লাল চাদরটা নিতে চাইছিল। আমি দেইনি। আসলে বিষয়টিকে আমি গুরুত্ব দেইনি। পরে বুঝলাম কাজটা আমার ঠিক হয়নি। আমাদের ছেলেরা ভালোভাবে মানুষ হোক। তাদের নিয়ে এখন আমাদের গর্ব হচ্ছে ।’

শিহাব ও লিটনের পরিবার রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করছে। দুটো পরিবারই দরিদ্র। কৃষি কাজ করে তাদের সংসার চলে। কিন্তু সরকারি সহযোগিতায় তাদের ছেলেদের পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ করতে চান তারা।

সেদিন রেললাইনের এ জায়গাতেই ছিল ফাটলমঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে কথা হয় আড়ানি রেল স্টেশনের মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান নয়নের সঙ্গে।  তিনি বলেন, ‘ এ ঘটনায় এ পর্যন্ত  কোনও তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। তবে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ খোঁজ-খবর নিচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভবনা ছিল। মালবাহী গাড়ি তো একটু কম গতিতে চলে। কিন্তু রাজশাহী থেকে ঢাকামুখী ট্রেনগুলো আড়ানি স্টেশনে না থামার কারণে এই রেললাইনে বেশি গতিতে চলাচল করে। সেক্ষেত্রে মালবাহী ট্রেন অতিক্রম করলেও যাত্রীবাহী ট্রেনের দুর্ঘটনার সম্ভবনা ছিল বেশি। ছেলে দুটো তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দুর্ঘটনা থেকে মালবাহী ট্রেন রক্ষা করেছে। ’

এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে  লিখেছেন ‘Heroes ofArani, আমার নির্বাচনি এলাকায় আড়ানি রেললাইনের পাশেই আবাস তাদের। তাদের সারাজীবনের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছি।’ তার স্ট্যাটাসে অনেকেই বিভিন্ন  মন্তব্য করেছেন।  দুই শিশুর বুদ্ধিতে একটি তেলবাহী ট্রেন রক্ষা পেয়েছে। এজন্য তাদের বিভিন্ন উপাধি দিয়ে নানান শ্রেণিপেশার মানুষ ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন।

এদের মধ্যে কয়েক জনের মন্তব্য হচ্ছে, জহির হোসেন -‘স্যালুট ছোট ভাই তোমাদের’, অরুণ চৌধুরী-‘সাবাশ যোদ্ধা’, নবী আলম-‘সাবাস বাবা, তোমাদের জানাই সালাম’।

উপহার হাতে দুই বীরশিশু লুৎফর রহমান লিখেছেন-‘জ্বী। বাঘায় বাঘের বাস! দেশপ্রেমিক শিশু বীর সিহাব ও টিটোন তার উদাহরণ। স্যালুট শিশু বীর সিহাব-টিটোন! শিগগিরই তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে গো ভাই। এলাকার গর্ব উপহার দিলে। শাহরিয়ার আলম সাহেব পাশে থেকে, এ দুই শিশু বীরের জন্য বীরোচিত ভূমিকা রাখবেন-এ প্রত্যাশা দৃঢ় করা হলো।’ জাহেদ খান সুমন লেছেন-‘খুব বড় বীরত্বের কাজ করেছে ওরা, দেশের বুদ্ধিজীবীরা এদের নিয়ে চিন্তা করুক এবং সরকারের পক্ষ থেকে এদেরকে পুরস্কার দেওয়া হোক।’ বণি আমিনের স্ট্যাটাস-‘দেশপ্রেম কী, এদের থেকে ঘুষখোর দুর্নীতিবাজদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। তোমরাই আগামী দিনে আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাবে।’ শেখ আজিজ আহমদ মুন্না লিখেছেন- ‘শাহরিয়ার ভাই এদের ভালো করে আগলে রাখেন। এত কম বয়সে এত বড় মেধা আর সাহসের পরিচয় দেওয়া সাধারণ ৮-১০ জনের পক্ষে সম্ভব নয়। ট্রেন আসছে তারপরও সামনে মাফলার ধরেই আছে।’ রেলওয়ে কর্মচারী এসকেএম জনির স্ট্যাটাস- ‘আমি একজন সহকারী লোকো মাস্টার। আমি হলেতো ভেবে নিতাম, ওরা হয়তো এমনি খেলা করছে লাল মাফলার নিয়ে। এত ছোট ছোট ছেলের মাথায় এই বুদ্ধি কেমনে আসলো।’ রবিউল আলম  লিখেছেন-‘বাংলার বীর নতুন যোদ্ধা এরাই পারবে দেশকে এগিয়ে নিতে।’

প্রসঙ্গত, সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানি স্টেশনের ৪০০ মিটার পূর্ব দিকে ঝিনা রেলগেটে রেললাইন ভাঙা দেখে লাল রংয়ের একটি মাফলার উঁচু করে ওড়াতে থাকে  দুই শিশু শিহাব ও লিটন ।তখন ওই রেললাইনে আসা তেলবাহী ট্রেনটি থেমে যায়। তাদের  বুদ্ধিতে ইঞ্জিনসহ ৩২টি বগির একটি তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পায়।