ভাষা সৈনিক গাজী শহীদুল্লাহ’র জন্মও ভাষার মাসেই, ১৯৩৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানার গিলাতলা গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা গাজী শামসুর রহমান ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও ইউনিয়ন মুসলিম লীগের সম্পাদক।
খুলনার ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে খুলনায় ভাষার দাবিতে প্রথম মিছিল ও সমাবেশ হয়। শুরুতে এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শহীদ আনোয়ার হোসেন, সন্তোষ দাস গুপ্ত, স্বদেশ বোস ও কবি ধনঞ্জয় দাস। তবে খুলনা শহরের আহসান আহমেদ রোডে তখন এ কে শামসুদ্দীন আহমেদ সুনুর ‘আজাদ গ্রন্থাগারে’ ভাষাপ্রেমীদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলির খবরে উত্তাল হয়ে ওঠে খুলনা। তখন এম এ গফুরকে আহ্বায়ক করে ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করে শুরু হয় জোরালো আন্দোলন। এসব আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীদের অন্যতম ছিলেন গাজী শহীদুল্লাহ।
গাজী শহীদুল্লাহ পরে দৌলতপুর বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএল কলেজে খুলনা জেলার প্রথম শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। তিনি ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিল এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলা-তালা আসনে ভাসানী ন্যাপের হয়ে সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেন।
৮০ বছর বয়সী গাজী শহীদুল্লাহ আজীবন ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে এসেছেন। বারবার প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন মহলে এ দাবি জানিয়ে কোনও ফল না হলে এ নিয়ে হতাশাও জানান তিনি। কিছুদিন আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘ভাষা সৈনিকরা জীবন বাজি রেখে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। অনেক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মায়ের ভাষা ‘বাংলা’কে প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা। সেসব ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্র কোনও ধরনের স্বীকৃতি দেয়নি— এটা মেনে নেওয়া কষ্টের।’’
খুলনার ভাষা সৈনিকদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। যারা বেঁচে আছেন, তারাও অবহেলিত। রাষ্ট্রীয় কোনও স্বীকৃতি না পাওয়া এসব ভাষা সৈনিকদের দিন কাটছে নিরবে-নিভৃতেই। তারাও হয়তো একদিন গাজী শহীদুল্লাহ’র মতোই আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে চিরবিদায় নেবেন।