গত বছরের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার একটি বাড়িতে ডাকাতির পর ওই ঘরে থাকা চার নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে আদালতে ভিকটিমদের দেওয়া জবানবন্দিতে জানা যায়, দুই নারীকে ধর্ষণ এবং অন্য দুজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ডাকাতরা। এছাড়া, ডাক্তারি পরীক্ষায়ও চার জনের মধ্যে দু’জনকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় ছয় আসামির মধ্যে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুই আসামিকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের মধ্যে একজনের নাম-ঠিকানা পেয়েছি। নারায়ণগঞ্জে তার বাড়িতে আমরা অভিযান চালিয়েছিলাম। কিন্তু সে বাড়িতে না থাকায় গ্রেফতার করতে পারিনি। অপরজনের পরিচয় জানার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যার নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি সে-ই এ ঘটনার মূল হোতা। সেই মূলত ডাকাতির জন্য সবাইকে সংঘবদ্ধ করে। আমরা তাকে ধরার চেষ্টা করছি।’
এদিকে, এই মামলা পিবিআই’র কাছে হস্তান্তরের আগে থানা পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় তিন যুবককে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তাদের টিআই প্যারেড করানোর কথা ছিল। কিন্তু পরে পিবিআই যেসব আসামি গ্রেফতার করে তারা আদালতে জবানবন্দি দেওয়ায় ওই তিন যুবকের টিআই প্যারেড করানো হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘তাদের কী অবস্থা জানা নেই। জামিন পেয়েছেন নাকি কারাগারে আছে, তাও জানি না। তবে আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওই তিন জনের কারও নাম আসেনি।’
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দুল মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। এই মামলা সংক্রান্ত কোনও তথ্য থানা পুলিশের কাছে নেই।’
তবে স্থানীয় বড় উঠান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিদারুল আলম জানান, ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার তিন যুবক ছাড়া পাননি। তারা এখনও চট্টগ্রাম কারাগারে রয়েছেন। তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত লুট হওয়া কোনও মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
ভিকটিম ওই পরিবারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ রাজি হননি।
ভিকটিমদের মধ্যে একজন তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ডাকাতরা ঘরে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার, ৫টি মোবাইল ফোনসেট ও ৮৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়, পরে অস্ত্রের মুখে দুজনকে ধর্ষণ করে। প্রথমদিকে এ ঘটনায় চার নারী ধর্ষণের কথা আলোচনায় আসলেও পরে ভিকটিম নারীদের জবানবন্দিতে জানা যায়, ডাকাতরা ওই ঘরের দুই নারীকে ধর্ষণ করে। অন্য দুজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। গত ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু ছালেম মোহাম্মদ নোমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় চার নারীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এছাড়া ডাক্তারি পরীক্ষায়ও চার জনের মধ্যে দু’জনকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছিল, তারা বারবার থানায় যাওয়ার পরও পুলিশ প্রথম দিকে মামলা নিতে রাজি হয়নি। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের হস্তক্ষেপে গত ১৭ ডিসেম্বর মামলা গ্রহণ করে থানা পুলিশ। মামলা দায়েরের পরপরই এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে। যদিও তাদের কারও সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও তথ্য পায়নি পিবিআই। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় থানা পুলিশ ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় গত ২৬ ডিসেম্বর এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই।
তদন্তভার গ্রহণের পর পিবিআই এ পর্যন্ত চার জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে মিজান মাতব্বর ও আবু শামা নামে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আবু শামার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আব্দুল হান্নান ওরফে হান্নান মেম্বার নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করে পিবিআই। সবশেষ ৩ জানুয়ারি বিকালে ঢাকার সায়েদাবাদ এলাকা থেকে জহিরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
জবানবন্দিতে মিজান মাতব্বর জানায়, স্থানীয় বাসিন্দা আবু শামার সহযোগিতায় ওই বাড়িতে পাঁচ জন মিলে ডাকাতি করে। তবে আবু শামা ওই বাড়িতে না ঢুকে বাইরে অপেক্ষা করছিল। আবু শামার জবানবন্দিতেও বিষয়টি উঠে আসে। সে জানায়, এই ঘটনার সঙ্গে সেসহ আরও পাঁচ জন জড়িত। যাদের মধ্যে চার জনকে পিবিআই সদস্যরা গ্রেফতার করেছে।