সমর চৌধুরী বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এলএলবি পাস সমর চৌধুরী আগে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জজ কোর্টে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি পরিবার নিয়ে নগরীর নন্দনকানন এলাকায় থাকেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, তার বয়স ৬৫ বছর। তবে পুলিশ তার বয়স ৫৩ বলে উল্লেখ করেছে।
উল্লেখ্য, সমর চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর তার হাতে বন্দুক ধরিয়ে একটি ছবি তোলা হয় এবং সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকে এই ছবির ও সমর চৌধুরীকে গ্রেফতারের নিন্দা জানান।
সমর চৌধুরীর মেয়ে অলকানন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রবিবার (২৭ মে) আদালতের কাজ সেরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসায় দিকে আসছিলেন বাবা। ওই সময় জহুর হর্কাস মার্কেটের সামনে এলে সাদা পোশাকদারী কিছু পুলিশ সদস্য বাবাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল (২৯ মে) আদালতে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আমাদের জানিয়েছেন, মাইক্রোবাসে তুলে পুলিশ সদস্যরা কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে তাকে চরণদ্বীপ খালের পাশে নিয়ে যায়। মাইক্রোবাসে পুলিশ সদস্যদের কথোপকথন থেকে তিনি বুঝতে পারেন তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার জন্য সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওখানে যাওয়া মাত্র পুলিশের কাছে দুই-তিনটি ফোন আসে। এরপর পুলিশ ওখান থেকে মাইক্রোবাস ঘুরিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে ঘরে আগে থেকে রেখে দেওয়া অস্ত্র ও ইয়াবা দিয়ে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।’
অলকানন্দ চৌধুরী বলেন, ‘জায়গা-জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় বাবা আমাদের এলাকার প্রতিবেশী স্বপন দাশকে সহযোগিতা করায় তার ভাতিজা সঞ্জয় দাশ পুলিশকে দিয়ে বাবাকে ফাঁসিয়েছেন। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের দিকে সঞ্জয় দাশ নন্দনকাননের বাসায় এসে আমাদের শাসিয়ে যান। তখন বাবাকে ইয়াবা মামলা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে যান।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঞ্জয় দাশ জোর করে তার চাচার জমি দখল করতে চান। এ ঘটনায় সঞ্জয় দাশের চাচা স্বপন দাশ আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটির পক্ষে আমার বাবার সিনিয়র আদালতে লড়ছেন। আমার বাবার সহযোগিতার কারণে স্বপন দাশের জায়গা জোরপূর্বক দখল করতে না পারায় তিনি বাবার পেছনে লাগেন। বাবাকে এর আগেও একটি ইয়াবার মামলায় ফাঁসানো হয়। সেই মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন।’
অলকানন্দ চৌধুরী আরও বলেন, ‘স্বপন দাশের বাড়ির কেয়ারটেকার মদন দত্তকে প্রধান আসামি করে ওই মামলায় স্বপন দাশ ও আমার বাবাকে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সহযোগী হিসেবে মামলায় আসামি করা হয়। শুধু তাই নয়, জায়গা দখল করতে সঞ্জয় দাশ তার চাচা স্বপন দাশের ছেলেকেও ঢাকা থেকে অপহরণও করেছিলেন। সঞ্জয় পুলিশের এক ডিআইজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এলাকায় ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে পুলিশি মামলা-হামলা দিয়ে হয়রানি করেন।’
অলকানন্দের অভিযোগ অস্বীকার করে বোয়ালখালী থানার ওসি হিমাংশু দাশ রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত আসামিকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। সমর চৌধুরীর গ্রেফতারের সঙ্গে জায়গা-জমি সংক্রান্ত কোনও ঘটনার যোগসাজশ নেই। তার নামে থানায় এর আগে আরও দুটি মাদকের মামলা ছিল। সমর চৌধুরী হত্যা মামলার আসামিও ছিলেন। যদিও পরে ওই মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। বর্তমানে তার নামে থানায় চারটি মাদকের মামলা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অস্ত্র ও ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর প্রশ্নই আসে না। সমর চৌধুরী আগে দায়ের করা একটি মাদকের মামলার পলাতক আসামি ছিলেন। রবিবার তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সমরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তার গ্রামের বাড়ির ঘর থেকে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার করে।’
থানায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে সমর চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাদকের এই চারটি মামলা হয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয়। এরপর গত ১৫ মার্চ তার বিরুদ্ধে বোয়ালখালী থানায় আরেকটি মামলা হয়। অপর দুটি মামলা গত ২৮ মে দায়ের করা হয়। এর আগের দিন (২৭ মে) রাতে পুলিশ তাকে জহুর হকার্স মার্কেট থেকে গ্রেফতার করে।
সমর চৌধুরীর বিষয়ে জানতে চাইলে সারোয়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমর চৌধুরী এলাকায় থাকেন না। তবে আমরা তাকে যতটুকু জানি, সে এ ধরনের কাজে জড়িত থাকতে পারে না। তাকে কখনও সিগারেট খেতেও দেখিনি।’
বেলাল হোসেন সারোয়াতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সমর চৌধুরী ব্যক্তি হিসেবে অনেক ভালো। তিনি অনেক আগ থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। জায়গা-জমি সংক্রান্ত একটি মামলাকে কেন্দ্র করে সঞ্জয় দাশ নামে এক প্রবাসীর সঙ্গে তার ঝামেলা চলছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঞ্জয় এলাকায় এক জিআইজির কাছের মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়। সে বাড়িতে এলে পুলিশ তাকে এস্কট দেয়। একজন প্রবাসী কীভাবে পুলিশি নিরাপত্তা পায় আমার বুঝে আসে না।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুরেশ চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সঞ্জয় দাশের যোগসাজশে পুলিশ পরিকল্পিতভাবে সমর চৌধুরীকে ফাঁসিয়েছেন। এ বিষয়ে কথা বলায় থানা পুলিশ মঙ্গলবার রাতে আমার বাসায় গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে। আমাকে ইয়াবা ও অস্ত্র মামলা দিয়ে চালান করে দেবে বলে হুমকি দেয়। পুলিশের ভয়ে আমি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
সুরেশ চৌধুরী বলেন, ‘সঞ্জয় দাশ তার চাচা স্বপন দাশের ছেলেকে অপহরণ করে তার কাছ থেকে ১১ কানি জমি নিজের নামে লিখে নেয়। কিন্তু তার আগে আবু তাহের নামে একজনের নামে জায়গাটি রেজিস্ট্রি থাকায় ওই জমি সঞ্জয় দখল করতে পারছেন না।’
এ সম্পর্কে জানতে স্বপন দাশের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।