বৃহস্পতিবার যমুনার পাড়ে খোলা আকাশের নিচে পাউবোর বাঁধে অসুস্থ ওই দুই নারী রোগীকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে উদ্ধারের সময় সিরাজগঞ্জ আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি হাসপাতালের লাল সিলমোহরযুক্ত বেডসহ সাদা চাদরে ঢাকা ছিলেন তারা।
যমুনার পাড় থেকে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তির পর তাদেরকে এখন মেঝেতে রেখে উদ্ধারকৃত নোংরা বিছানা ও ময়লা চাদরেই শুইয়ে শুধু স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে হাসপাতালের অন্য রোগীরা তাদের দেখে মুখ ঢেকে চলতে দেখা গেছে।
সিভিল সার্জন ডা. কাজী শামিম হোসেন শুক্রবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত। স্বাস্থ্য মহাপরিচালক মহোদয় ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য ফোনে নির্দেশ দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক স্যার ছুটিতে আছেন। তার সঙ্গে আলাপ করে আগামীকাল হয়তো কমিটি গঠন করা হতে পারে।’
স্থানীয়রা জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলার এ হাসপাতালটিকে এরই মধ্যে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে নামকরণ করা হয়েছে। রোগীর প্রতি অধিক যত্নবান ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ হাসপাতাল পরিদর্শনে এলেই চিকিৎসক ও নার্সদের সেবার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দেন। কিন্তু এত কিছুর পরও মোটেই সতর্ক হননি বঙ্গমাতার নামকরণের এ হাসপাতালটির বেশির ভাগ চিকিৎসক ও নার্সরা।সাধারণ রোগীর প্রতি অবহেলা বা জটিল রোগী পেলেই অন্যত্র রেফার্ড করার প্রবণতাও বেশি তাদের।
বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে সরেজমিনে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসের মধ্যে ওই দুই অসহায় নারী রোগীকে আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বয়স্ক নারীকে গত এক সপ্তাহ আগে ভর্তি করে পুলিশ, আরেকজন প্রতিবন্ধী নারীকে গত এক মাস আগে ভর্তি করেন স্থানীয়রা। কিন্তু, ওই নারীদের অজ্ঞাত হিসেবেই জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলেও তাদের রেকর্ডপত্র দেখাতে নারাজ এখানকার দায়িত্বরতরা। তবে, এ রোগীদের এখানে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি সকলেই স্বীকার করেছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের নতুন সম্প্রসারিত ভবনের ৪ তলায় ফিমেল সার্জারি ওয়ার্ডের মেঝেতে রেখেই বেশ কিছুদিন থেকেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল ওই দুই নারী রোগীকে। দুজনেই শারীরিকভাবে দুর্বল। বিছানায় পেশাব-পায়খানা করায় তাদের নিয়ে বিরক্ত ছিল দায়িত্বরতরা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার সময় ৪ জন মুখে মাস্ক পরিহিত লোক তাদের ভ্যানে হাসপাতাল থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর দুপুর থেকে তাদের দুজনকেই অসহায়ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় পাউবোর শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন রাসেল পার্কের রাস্তার পূর্ব পাশে।
সদর হাসপাতালের ফিমেল সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী সদর উপজেলার পিপুলবাড়িয়ার সুফিয়া খাতুন ও বেলকুচির শিউলী বেগম যারা এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তারা বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের সামনেই গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘বিছানায় পেশাব-পায়খানা করায় হাসপাতালের দায়িত্বরত নার্স, ওয়ার্ড বয় বা চিকিৎসক কেউই এ দুজনের খোঁজখবর নিতেন না। বৃহস্পতিবার সকালে ৪-৫ জন লোক হাসপাতাল থেকে তাদের হঠাৎ নিয়ে যায়। আমরা ভেবেছি, হয়তো উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোথায়ও স্থানান্তর করা হচ্ছে। যারা নিয়ে যায় তাদের মুখে মাস্ক থাকায় আমরা চিনতে পারিনি।’
এদিকে, ফিমেল সার্জারি ওয়ার্ডের ডিউটি রোস্টার বোর্ড থেকে জানা যায়, সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছা. ফাহমিদা খাতুন, নমিতা দাস ও শাহনাজ পারভীন এবং চিকিৎসক ডা. মোখলেছুর রহমান ও ডা. নাজমুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।
এ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রমেশ চন্দ্র সাহা বৃহস্পতিবার বিকালে সাপ্তাহিক ছুটিতে ঢাকা গেছেন। হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মানসী গোস্বামী শুক্রবার সকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই অমানবিক। দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টিও অমার্জনীয়।’
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘রোগী ফেলার বিষয়টি আমরাও শুনেছি। প্রতিদিন শত শত রোগী ভর্তি হয়। কখন কে ভর্তি হচ্ছে, তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।’
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অপাতত রোগী দুজনকে এ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক স্যার আগামী রোববার আসবেন। তারপর তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
সিরাজগঞ্জ আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রমেশ চন্দ্র সাহা বিকালে মোবাইল ফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মহাপরিচালক স্যারের নির্দেশে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য এরই মধ্যে সিভিল সার্জনকে বলা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জ আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি হাসপাতালের বেড ও বিছানার চাদরে ঢাকা অজ্ঞাত অসুস্থ্ দুই নারীকে ফেলে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায় যমুনার তীরে পাউবোর বাঁধে। দুজনের শরীর থেকে পেশাব-পায়খানার গন্ধ আসায় দূর থেকেই ভিড় করেন শত শত দর্শনার্থী। পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য বিভাগ ও সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানান।