‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর’-এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাজশাহীতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী জীবনানন্দ কবিতামেলা। কবি ও লেখকদের সংগঠন ‘কবিকুঞ্জ’ রাজশাহী নগরীর শাহ্ মখদুম কলেজ মাঠে এই মেলার আয়োজন করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও দুই বাংলার কবিদের আড্ডায় জমে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় মেলার উদ্বোধন করেন কবি সরোজ দেব।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘বলা চলে সারা বছর ধরেই এ অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় থাকি। ঢাকার বাইরে এই কবিতামেলা অনেকটা উৎসবের মতো। ঢাকার কথা বাদই দিলাম। সেখানে অনেক অনুষ্ঠান হয়, অনেক সংগঠন আছে। এগুলোর অনেক ডালপালা আছে, কিন্তু শেকড়ের খোঁজ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা আলোচনা সভায় জীবনানন্দকে নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। তার কবিতায় এমন অনুভূতি-অনুভব সৃষ্টি করে যে এতে মূর্ত-বিমূর্ত একাকার হয়ে যায়। তিনি বলেন, কবিতা হচ্ছে অমূল্য বস্তু। অমূল্য বলেই কবিদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ, অকবিদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ! কারণ কবিতা যেখানে পৌঁছায়, অন্য কোনো বস্তু সেখানে পৌঁছাতে পারে না।’
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাসুম হাবীব বলেন, ‘বাংলায় লেখা ও কথা বলায় প্রমিত রীতির দিকে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে ভাষার যে বিকৃতি দেখা যাচ্ছে তা রোধ করতে হবে। ইদানীং যেন জাতে ওঠার জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজ গজিয়ে উঠছে। শিক্ষার একাধিক মাধ্যম দেখা যাচ্ছে। বাংলা ভাষাই শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত। শিক্ষাব্যবস্থা একমুখী হওয়া উচিত। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।’
অনুষ্ঠানে রাজশাহী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সময়ে একটা কথা প্রায়ই বলা হতো যে, দেশ এখন কোথায় আছে? এ প্রশ্ন এখনও ওঠে। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছেন যেখান থেকে নামানোর ক্ষমতা কারও নেই।’
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজশাহী নগরীর শাহ্ মখদুম কলেজের শহীদ মিনারের পাদদেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন কবি আসাদ মান্নান ও কবিকুঞ্জের পতাকা উত্তোলন করেন সংগঠনের সভাপতি রুহুল আমিন প্রামাণিক। এরপর অতিথিরা মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। সেখানে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কবি আলমগীর মালেক। স্বাগত বক্তব্য দেন কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হক কুমার। এ পর্যায়ে অতিথিগণ কবিকুঞ্জ পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন করেন।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক চৌধুরী, রাজশাহী জেলা জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বিভাগীয় সমন্বয়কারী কামারউল্লাহ সরকার এবং রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক কামরুজ্জামান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য কবি আসাদ মান্নান, কবি জুলফিকার মতিন, মাহমুদ কামাল, দিল্লির কবি প্রাণজি বসাক প্রমুখ।
শুক্রবার বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে কবিকুঞ্জের সহসভাপতি শফিকুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে জীবনানন্দ স্মারক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক কবি কামরুজ্জামান গোপন। আলোচক ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোস্তাক আহমেদ ও কবি ফরিদ আহম্মদ দুলাল।
এরপর পর্যায়ক্রমে কবিতাপাঠ করেন ৩২ জন কবি। কলকাতার সাংস্কৃতিক সংগঠক সুশীল সাহার সভাপতিত্বে এ পর্বে সঞ্চালনা করেন গল্পকার নূরুন্নবী শান্ত ও শাহনেওয়াজ প্রামানিক সুমন। এরপর চলে দলীয় ও একক আবৃত্তি পরিবেশনা। শেষ পর্বে ৩৫ জন কবিতা পাঠ করেন।
মেলা প্রাঙ্গণে বসেছে বাংলা একাডেমির ও স্থানীয় বিদ্যাসাগর এর বইয়ের দোকান। মঞ্চের সামনের চেয়ারে বসা অতিথি ছাড়া কবিদের আড্ডা ছড়িয়ে পড়েছে বই দোকান, মেলা প্রাঙ্গণের শহীদ মিনার চত্বর হয়ে সারা মাঠে। দুই বাংলার কবিদের প্রকাশিত কবিতার বই বিনিময়, আলাপচারিতা নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠেছেন কবিরা।
এদিকে মেলার দ্বিতীয় দিন শনিবার (২৭ অক্টোবর) প্রথম অধিবেশনে (সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত) কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সঙ্গীত ও আড্ডা। সমাপনী অধিবেশনে ( বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত) আবৃত্তি ও সঙ্গীত এবং কবিকুঞ্জ পদক ও সম্মাননা প্রদান। এবার কবিকুঞ্জ পদক পাচ্ছেন কবি মাহবুবুর রহমান বাদশাহ ও ছোটকাগজ সম্মাননা পাচ্ছেন শব্দ সম্পাদক কবি সরোজ দেব। এছাড়াও চিত্রাঙ্গন, স্বরচিত কবিতা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা।