সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় গত ৬ এপ্রিল এক ছাত্রীকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে বোরকা পরা চার ব্যক্তি তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। কারা তার শরীরে আগুন দিয়েছে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ঘটনার আগের রাত থেকে ওই মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে কিছু বহিরাগতকে আনাগোনা করতে দেখা গেছে। ঘটনার সঙ্গে এদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্র-শিক্ষকসহ স্থানীয় কয়েকজন। তথ্য থাকলেও আতঙ্কে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না তারা। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এই তথ্য জানা গেছে।
মাদ্রাসার সঙ্গে সংশিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জানান, মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাহ কয়েক মাস আগে ওই ছাত্রাবাস খুলেছেন। ছাত্রাবাসে ছাত্রদের সঙ্গে বহিরাগতদের আনাগোনা সবসময় দেখা যেতো। এমনকি আওয়ামী লীগের স্থানীয় কিছু নেতাকে সঙ্গে নিয়ে আশপাশের বিভিন্ন দোকান থেকে খাবার এনে ছাত্রাবাসে খাওয়াদাওয়াও করতেন সিরাজ-উদ দৌলাহ।
স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ওই ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর পুলিশি হয়রানি কিংবা গ্রেফতার এড়াতে জড়িতদের কেউ কেউ গা-ঢাকা দিয়েছে। তবে কয়েকজনকে ঘটনার পর থেকে কারাগারে সিরাজের সঙ্গে এবং জেলা প্রশাসন ও থানায়ও আনাগোনা করতে দেখা যাচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, স্কুলছাত্রীকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তাদেরই কেউ কেউ পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদ্রাসার ভেতর ও বাইরে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা একটি বলয় তৈরি করে রেখেছিলেন। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের পাশাপাশি বর্তমান ও সাবেক কিছু ছাত্রও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসার তহবিল থেকে নানা কায়দায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় তাদের। একইভাবে মাদ্রাসা সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিকে এনামুল করিম এবং মাদ্রাসা কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রহুল আমিনের সঙ্গে তার রয়েছে দহরম-মহরম সম্পর্ক।’
মাদ্রাসা কমিটির সাবেক সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদ্রাসা সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব পিকে এনামুল করিমের কাছে ছাত্রছাত্রীরা নারীদের হয়রানি করাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেছে। কিন্তু কোনও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নাশকতা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার পরও কোনও ব্যবস্থা নেননি তিনি। গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ গ্রেফতারের পরও তিনি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেরি করেন। অবশেষে ওই ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার একদিন পর তিনি অধ্যক্ষকে সাময়িক বহিষ্কার করেন।’
শেখ মামুন বলেন, ‘ওই মাদ্রাসাছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেই ছাত্রীর নিরাপত্তায় কোনও ব্যবস্থা নেয়নি মাদ্রাসা কমিটি।’
শেখ মামুনের বক্তব্য সত্য নয় দাবি করে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিকে এনামুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানির চেষ্টায় অধ্যক্ষ গ্রেফতার হওয়ার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাদ্রাসা কমিটির ফোরামে আলোচনা করি। বিষয়টি তদন্তের পর চার্জশিট হলেই কেবল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবো এমন বিধান থাকায় আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। তবে ওই ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার পরপরই আমরা তাকে বহিষ্কার করি। একই সঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো হয়েছে।’
স্থানীয়রা জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এনামুল করিম নামে সভাপতি হলেও মাদ্রাসা অধ্যক্ষের মূল রক্ষক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রহুল আমিন। ওই মাদ্রাসাছাত্রীকে নিজ কক্ষে ডেকে এনে অগ্রিম প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভনে যৌন হয়রানির ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পরের দিন গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে যান অধ্যক্ষ সিরাজ। এ ঘটনায় সোনাগাজী মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও যখন সিরাজের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন, তখন সিরাজের সহযোগী ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মকসুদুর রহমান তার মুক্তির দাবিতে পাল্টা কর্মসূচি দেয়। মকসুদুর রহমান রুহুল আমিনের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত। এদের সঙ্গে সিরাজের পরিবারের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে রুহুল আমিন বলেন, ‘এগুলো সব মিথ্যা ও অপপ্রচার। মাদ্রাসা কমিটিতে আসার পর থেকে আমরা মূলত অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না।’
ফেনী পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধান আসামিকে রিমান্ডে এন জিজ্ঞাসাবাদ করলে এবং অগ্নিসংযোগকারীদের খুঁজে পেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যাবে।’ উল্লেখ্য, সিরাজ-উদ দৌলাকে আজ বুধবার সাত দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে ওই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আফছার হোসেন ও এই ছাত্রীর সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে এই মামলার এজাহারভুক্ত অপর চার আসামি নুর হোসেন, কেফায়েত উল্লাহ, আলাউদ্দিন ও শহীদুল ইসলামকে একই আদালত পাঁচদিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন। তারাও এখন কারাগারে রয়েছে।
আরও পড়ুন-
এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলার অবস্থায় নেই সেই মাদ্রাসাছাত্রী
মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা: সিরাজ উদ-দৌলাহ'র ৭ দিন রিমান্ড
গায়ে আগুন দিয়ে মাদ্রাসাছাত্রীকে হত্যাচেষ্টা: যা আছে মামলার এজাহারে