শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র ছাত্রীরা তাদের নির্দেশ মতো চলার জন্য বিশেষ কিছু নিয়ম চালু করেছে। ওই হোস্টেলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই নিয়ম। ফেসবুকে এ নিয়ে স্ট্যাটাসও দেওয়া আছে। সেখানে উল্লেখ আছে, সিনিয়র ছাত্রীরা টি-শার্ট পড়ে ডাইনিংয়ে খাবার-পানি আনতে যেতে পারবেন, তারা ক্যাম্পাসে ছেলে সহপাঠী কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন, তাদের দেখলেই সালাম দিয়ে জুনিয়রদের বলতে হবে “আপু ভালো আছেন”, শুধু তারাই ক্যাম্পাসে ছবি তুলতে পারবেন, তারা রুমে আসলে অসুস্থ হলেও জুনিয়রদের উঠে দাঁড়াতে হবে, তখন ফোন হাতে নেওয়া যাবে না, এমনকি হেডফোনও কানে দিতে পারবে না ইত্যাদি।
এছাড়া জুনিয়রদের হোস্টেলের সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। গত নয় বছর ধরে চলে আসা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার সকালে আইএইচটি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগমাধ্যম ‘ডিপ্লোমা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট অ্যান্ড নেটওয়ার্ক’ ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন ফিজিওথেরাপি বিভাগের ওই ছাত্রী। ওইদিন রাতেই তাকে হলের ডাইনিং রুমে ডেকে নিয়ে সবার সামনে অশালীন ভাষায় গালাগাল করে সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। এমনকি তার পরিবার নিয়েও কটাক্ষ করা হয়। এর জের ধরে রাগ, ক্ষোভ, অপমানে ওই রাতেই নিজের কক্ষে গিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। অসুস্থ অবস্থায় রাতেই তাকে ভর্তি করা হয় শেরে-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে।
বর্তমানে ওই ছাত্রীকে হোস্টেল থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছে সিনিয়ররা। তারা ওই ছাত্রীর সঙ্গে একই হোস্টেলে থাকবেন না বলে আল্টিমেটাম দিয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই শিক্ষার্থী জানান, হোস্টেলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলায় ক্ষুব্ধ হয় ল্যাবরেটরি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের জুঁই, মৌ ও ফাতেমা এবং একই বর্ষের ফিজিওথেরাপি বিভাগের লামমিম সহ অন্যরা। পোস্টদাতাকে খুঁজে বের করতে তারা শুক্রবার দুপুরের পর জুনিয়রদের সবার ফোন নিয়ে যাচাই-বাছাই করে। সন্ধ্যার পর তারা সবার ফোন ফেরত দিলেও তার ফোনটি আটকে রাখে। রাত পৌঁনে ৮টার দিকে হলের সব মেয়েদের ডাইনিংয়ে ডেকে নেয় তারা। এ সময় সিনিয়ররা দুর্ব্যবহার করে। এই দৃশ্য অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে দেওয়ার হুমকি দেয়। বকঝকার পর সবাই যে যার কক্ষে চলে গেলেও তাকে সিনিয়রদের কক্ষে রাত্রী যাপন করতে বলে। এ সময় টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে আমেনা নিজের কক্ষে আসে। রাগে ক্ষোভে-অপমানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সহপাঠীরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে উদ্ধার করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মেডিকেলে ভর্তি করে।
এ বিষয়ে হোস্টেলের ডেপুটি সুপার সুবোধ রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘ওই ছাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছে সে।’ মহিলা হোস্টেলের অভ্যন্তরীণ নিয়মগুলো কর্তৃপক্ষের নয়, তাদের নিজেদের বানানো দাবি করে সুবোধ রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে এ ধরনের কোনও নিয়ম নেই। সেখানে আইন সবার জন্য সমান। সেখানে কেউ অন্যায় করলে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কোনও সিনিয়রকে জুনিয়রদের শাষণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।’
অভিযুক্তদের একজন তৃতীয় বর্ষের লামিয়া সিকদার লামমিম ওই ছাত্রীকে অভিযুক্ত করে বলেন, ‘ও খুবই বেয়াদব। তাকে কেউ পছন্দ করে না। তার কক্ষেও কেউ যায় না। সে এর আগেও আপত্তিকর কাজ করেছে। প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীরা এখন যে নিয়ম পালন করছে, আমরাও জুনিয়র থাকা কালে এই নিয়ম পালনে বাধ্য ছিলাম। সিনিয়র হলে তারাও এই সুবিধা পাবে।’ লামিয়াকে কোনও অপমান করা হয়নি এবং তাকে বা তার পরিবার নিয়েও কোনও কটাক্ষ করা হয়নি বলে দাবি করেন লামিয়া।
আইএইচটি’র অধ্যক্ষ ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার রাতের এই ঘটনার পর গতকাল ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীদের ডেকে বাড়াবাড়ি না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।’ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হবে বলে জানান অধ্যক্ষ।