৮ বছরেও শেষ হয়নি নরসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যার বিচারকাজ

স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে লোকমান হোসেননরসিংদীর জনপ্রিয় পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের আট বছর পূর্ণ হচ্ছে ১ নভেম্বর। ২০১১ সালের এই দিনে দলীয় কার্যালয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি এ হত্যার বিচারকাজ। প্রায় সাত বছর পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্রের ওপর বাদীর করা নারাজি আবেদন গ্রহণ করেছেন আদালত। এর ফলে মামলাটির পুনঃতদন্তের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন মামলার বাদী লোকমানের ছোট ভাই ও বর্তমান পৌর মেয়র মো. কামরুজ্জামান কামরুল।

মামলার বাদী কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রটি সঠিক ছিল না। সেখানে অভিযুক্ত ১৪ আসামির মধ্যে ১১ আসামিকেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাই আমরা নারাজি দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। উচ্চ আদালত আমাদের আবেদন গ্রহণ করে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। আমার বিশ্বাস, এর মাধ্যমে এ হত্যার প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসবে।’

মামলার বাদী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ হত্যার ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই কামরুজ্জামান তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্তের পর এজাহারভুক্ত বাচ্চুসহ ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে নতুন করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে মামলার এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন মোবা, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তার ছোট ভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এদিকে অভিযোগপত্র দাখিলের আগেই মোবারক হোসেন মোবা ছাড়া সবাই আদালতের মাধ্যমে জামিনে বের হয়ে যান। সাত বছর পর গত বছরের ২৯ অক্টোবর মোবাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিও বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। 

পুলিশি তদন্তে এ হত্যা মামলার এজাহার বহির্ভূত আসামি শরিফুল ইসলাম শরিফ এবং তার অপর তিন সহযোগীকে অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

এদিকে, পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ২০১২ সালের ২৪ জুলাই নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি দেন মামলার বাদী মো. কামরুজ্জামান কামরুল। আদালত ২৫ জুলাই নারাজি আবেদন খারিজ করে অভিযোগপত্র বহাল রাখেন। পরে ২৮ আগস্ট নারাজি আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন বাদী। আদালত ২ সেপ্টেম্বর সেই আবেদন গ্রহণ করে ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে ফের নারাজি আবেদন খারিজ করেন। এরপর উচ্চ আদালতে যান বাদী।

তিনি ওই অভিযোগপত্র বাতিল করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। আদালত বাদীর আবেদনটি আমলে নিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত করে দেন। এ ঘটনায় জামিনে বের হয়ে আসামিরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল ডিভিশনে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় থাকার পর আদালত চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আসামিদের করা রিট পিটিশনটি নিষ্পত্তি করে বাদীর নারাজি আবেদন গ্রহণ করতে এবং বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২৫ জুন দুপুরে নরসিংদী জজ আদালতের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. রকিবুল ইসলাম মামলার বাদী কামরুজ্জামানের জবানবন্দি গ্রহণের মাধ্যমে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আসাদ আলী বলেন, ‘আদালতের মর্জি অনুযায়ী মামলাটি মুখ্য বিচারিক হাকিম নিজে কিংবা অন্য কোনও সংস্থা কর্তৃক পুনঃতদন্তের আদেশ হতে পারে।’

লোকমান হত্যার অষ্টম বার্ষির্কী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘জনবন্ধু শহীদ লোকমান পরিষদ’। লোকমান হোসেনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া মাহফিল, গণভোজসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে সংগঠনটি। এছাড়া দলীয়ভাবেও পালন করা হবে হত্যার বার্ষিকী।

উল্লেখ্য, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পলাশতলী ইউনিয়নের মেঝেরকান্দি গ্রামের শাহ্ নেওয়াজ ভূঁইয়ার ছেলে লোকমান হোসেন কলেজজীবন থেকেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। পরে নরসিংদী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। জনপ্রিয়তার কারণে ২০১১ সালের পৌর নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন। এ সময় নরসিংদী পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নের কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মাত্র আট মাসের মাথায় ২০১১ সালের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।