বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হয় ২৫ মার্চের আগেই

১৯৭১ সালে পাকিস্তান যুদ্ধে নামার আগেই পরিকল্পনা করে বুদ্ধিজীবী নিধনের। তাদের ধারণা ছিল, বাঙালিকে প্রথম রাতে ভয় দেখাতে পারলে তারা চিৎকার করবে হয়তো, প্রতিরোধ করবে না। মুক্তিযোদ্ধারা এবং সেসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, এই কারণেই ২৫ মার্চ থেকেই শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। আর তার টার্গেট হয় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশের সূর্যসন্তানেরা।

২৫ শে মার্চের মাঝরাত থেকে দেশজুড়ে হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজের পাশাপাশি বাছাই করে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিধন-পর্বও চলছিল প্রায় প্রতিদিনই, এমনকি বিজয়ের পরেও। স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাসই সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বুদ্ধিজীবী হত্যা চলতে থাকে। পাকিস্তানি ঘাতকদের আত্মসমর্পণের ঠিক দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরের বীভৎস-নারকীয়-পাশবিক হত্যাকাণ্ড ছিল ইতিহাসে এক জঘন্য বর্বর ঘটনা। ঘাতক-দালাল চক্র এই পৈশাচিক-নির্মম নিধন যজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়।

গবেষকরা বলেন, ২৫ মার্চের তাণ্ডবের পরও যখন বাঙালিকে ভয় দেখানোর পরিকল্পনা সফল হয়নি বলে বুঝতে পারে পাকিস্তানিরা তখনই তাদের টার্গেট হয় এ দেশের মেধাবী সন্তানরা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো ২৫ শে মার্চের কাল রাত্রি। সেই কাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, চিকিৎসক, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ অসংখ্য মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। সে রাতেই ঘাতক-দালালদের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ফজলুর রহমান খান, গোবিন্দ চন্দ্র দেবসহ আরও অনেকেই এই কাল রাত্রিতেই শহীদ হন। সিলেটে চিকিৎসারত অবস্থায় হত্যা করা হয় ডাক্তার শামসুদ্দিন আহমদকে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও শাসকরা ভেবেছিল, এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাঙালি এর পরিবর্তে তীব্র প্রতিরোধে নামে। শুরু হয় গণযুদ্ধ। এতে নাখোশ হয়ে বুদ্ধিজীবীসহ বেসামরিক নাগরিক হত্যা আরও বাড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা।  

ডিসেম্বরের ৪ তারিখ ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারির পর একই মাসের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেওয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ চিহ্নিত দু’শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসররা জোরপূর্বক অপহরণ করে নির্যাতনের পর হত্যা করে বধ্যভূমিগুলোতে ফেলে রাখে।

স্বাধীনতার পর লাশ বহনকারী বাহনের চালক মফিজউদ্দিনের বয়ানে শোনা যায় ইসলামি ছাত্র সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য এবং পাকিস্তান রেডিওর সাবেক কর্মী আশরাফুজ্জামান খান নিজ হাতে সাত জন শিক্ষককে গুলি করে। আর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান ও স্বজনদের বয়ানে জানা যায়, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে চৌধুরী মঈনুদ্দিন সরাসরি জড়িত ছিল।

বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামানের একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, যা তাঁদের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অন্যতম প্রমাণ। ডায়েরিটিতে ১৯ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল। পাকিস্তানি গবেষক সেলিম মনসুর খালিদের লেখা আলবদর গ্রন্থ অনুসারে, ওই বইয়ের লেখকের কাছে আশরাফুজ্জামান ডায়েরি লেখার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে ঢাবির শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবীদের নাম যেখানে কয়েকজনকে টার্গেট করতে টিক চিহ্নও দেয়া হয়েছে

 একাত্তর পরবর্তীতে পাকিস্তানের সেনাদের বিচার না হওয়া এবং পাকিস্তানের চলমান অস্থিতিশীলতার বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বলেন, ঢাকার গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক ব্রিগেডিয়ারকে লে. জেনারেল করা হয়েছিল, লে. জেনারেল মো. খানকে বীরোত্তম খেতাব দিয়ে ব্রিগেডিয়ার র‌্যাংক দেওয়া হয়েছিল, লে. জেনারেল জেড এ খানকেও প্রমোশন দেওয়া হয়েছিল এবং ক্যাপ্টেন নাসির আলী খানকে কর্নেল পদে উন্নীত করা হয়েছিল। যারা গণহত্যা করেছে তারা যখন সেনা কমান্ডে এসেছে তারা তাদের অপকর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক। যে বা যারা গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তার বা তাদের বিচার না হলে খেসারত দিতে হবেই। তিনি আরও বলেন, প্রতিটা গ্রামে গেলেই দেখা যাবে কোন ক্যাম্প এলাকায় কোন কোন সেনাসদস্য অভিযুক্ত সে নামগুলো একাত্তরের ভুক্তভোগীরা জানেন। ফলে বিচার হওয়াটা জরুরি ছিল।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার করিব বলেন, গণহত্যার পরিকল্পনা তারা শুরু থেকেই করেছিল। এবং বাংলাদেশি দোসরদের সহায়তায় তারা বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করেছিল। জেনোসাইড ওয়ার ক্রাইম ও ম্যাস রেপের (যুদ্ধকালীন গণহত্যা ও গণধর্ষণ) কোনও ক্ষমা নাই। পাকিস্তানের দোসরদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বিচারও শুরু করতে হবে।