তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবারও আমের বাজারে রাজশাহী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। চাষি ও ব্যবসায়ীদের সব রকম সহযোগিতা করা হবে। এবার রোজার পরেই রাজশাহীর আমের বাজার জমজমাট হয়ে উঠবে। আবহাওয়া ও বাজারজাতকরণ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমে ৭৩৫ কোটি টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল হক জানান, এবার রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ করা হয়েছে। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। ফলন অনুযায়ী গড়ে ৩৫ টাকা কেজি দরে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৭৩৫ কোটি টাকার আম বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহীর নগরীর শালবাগান এলাকার ফল ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছয়-সাত দিন আগে গোপালভোগ আম গাছ থেকে নামিয়ে বাজারে নিয়ে আসতে পারবো। তবে লকডাউনের এই পরিস্থিতিতে যদি ঢাকা থেকে অর্ডার না পাই তাহলে সেই আম রোজার পরেই নামাবো। এবার পরিস্থিতি নিয়ে একটু ভয়েই আছি। পরিবহন সমস্যা হলে আম নিয়ে বিপদে পড়ে যাবো।’
রাজশাহী জেলার সবচেয়ে বেশি আম কেনাবেচা হয় পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে। বানেশ্বর বাজারের আলমগীর হোসেন নামে এক আড়তদার বলেন, ‘আড়তের পাশাপাশি আমরা কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে বাগান থেকে আম কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করি। এ বছর আমাদের প্রায় ৭৫ বিঘা আমবাগান কেনা আছে। করোনার কারণে এবার আমের বাজার কী হবে বলা মুশকিল।’
আমচাষি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন না হলে এবার আমে ব্যাপক লোকসান হতে পারে।’
পবা উপজেলার আমচাষি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমার ১০ থেকে ১২টা মতো আম গাছ আছে। বৃষ্টি হওয়ায় পরিচর্যা ভালো হয়েছে। ফলন নিয়ে তেমন চিন্তা করছি না। তবে ঝড় ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কে রয়েছি।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল হক বলেন, ‘আমের বাজারজাতকরণ নিয়ে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। অন্য জেলায় আম পরিবহনে ট্রাকসহ অন্য বাহন নিয়ে যেতে ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেই সঙ্গে বাগান থেকে বাজারে কিংবা আড়তে আম নির্বিঘ্নে নিয়ে আসতে পারেন চাষিরা, সেদিকটায় লক্ষ রাখার জন্য বলা হয়েছে। এজন্য তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতবারের মতো এবারও আগেই বাগান থেকে আম নামানো যাবে। আগের মৌসুমে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক ১৫ মে থেকে গুটিজাতীয় আম পাড়া ও কেনাবেচা শুরু হয়েছিল। এবারও সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আম পাড়া ও বেচাকেনা শুরু হবে। তবে এবার আমের মুকুল দেরিতে এসেছিল। তাই রোজার পরেই আমপাড়া ও বেচাকেনা শুরু হবে। এবার আমের ফলন ভালো হবে। কারণ, গাছে আমের ঘনত্ব যত কম হবে আকৃতি তত বড় হবে। ফলে ওজনও বাড়বে। এর মধ্যে পরিস্থিতি ভালো হলে তেমন সমস্যা নেই। আর অবনতি হলেও অর্থনৈতিক দিক চিন্তা করে আমরা সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
গত মৌসুমে বাগান থেকে আম পাড়ার জন্য জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ মে থেকে গুটি জাতীয় আম; ২০ মে গোপালভোগ; ২৫ মে রানীপছন্দ, খিরসাপাত ও হিমসাগর; ২৮ মে লক্ষ্মণভোগ ও লখনা; ২৫ মে ল্যাংড়া; ৬ জুন আম্রপালি; ১৬ জুন ফজলি ও সুরমা ফজলি আশ্বিনা ১ জুলাই নির্ধারণ ছিল।
এ ব্যাপারে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়েছে। আগের শিডিউল অনুযায়ী এবার চাষিরা বাগান থেকে আম নামাতে পারবেন। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আমের পরিবহন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে তেমন সমস্যা হবে না। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আম ক্রেতা ও বিক্রেতারা ব্যবসা করবে। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী ও চাষিরা যাতে আমে কোনও বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার না করতে পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং থাকবে।’
কোথাও কোনও অনিয়মের খবর পেলে তৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকাসহ অন্য এলাকার ব্যবসায়ীরা এবার রাজশাহীতে এসে কীভাবে আম কিনে নিয়ে যাবেন– এমন প্রশ্নে মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এলাকার ব্যবসায়ীদের রাজশাহীতে না এসে অর্ডার মোতাবেক আম কেনার জন্য অনুরোধ করা হবে। প্রয়োজনে তারা রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আম নিয়ে যাবে। সেইসঙ্গে তারা টাকা লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করবে, যাতে রাজশাহীতে করোনা আক্রান্তের হার বেড়ে না যায়।’