করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১৫ জনের মৃত্যু

করোনাভাইরাস

করোনায় আক্রান্ত হয়ে এবং উপসর্গ নিয়ে গাজীপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, নীলফামারী, মৌলভীবাজার, গোপালগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, খুলনায় আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন চিকিৎসকও রয়েছেন। এদের কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।


সিরাজগঞ্জ 

করোনা উপসর্গ নিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ও তাড়াশে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।  তারা হলেন, আব্দুল করিম (৭৫) ও নূর মোহাম্মদ (৫০)।

জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে শনিবার (১৩ জুন) সকালে নিজ বাড়িতে নূর মোহাম্মদ মারা যান তিনি। গত ক’দিন ধরেই তিনি শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার ভোর রাতে পরিবারের লোকজন তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। ওইসময় তিনি মারা যান।

উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আবু তাহের ফারুকী জানান, সংবাদ পাওয়ার পর তার পরিবারের সবার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। দাফনের জন্য সেচ্ছাসেবী টিমকে খবর দেওয়া  হয়েছে।

এদিকে, করোনা উপসর্গ নিয়ে তাড়াশে আব্দুল করিম নামে এক কৃষক মারা গেছেন। নওগাঁ ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া গ্রামে শনিবার সকালে তিনি মারা যান। গত ক’দিন ধরেই তিনি তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।

তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জামাল মিয়া জানান, খবর পেয়ে সেখানে মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়েছে।

আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মিজানুর রহমান জানান, ওই ব্যক্তির পরিবারের সবার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বরিশাল 

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ২ জনের করোনা পজিটিভ এবং অপর দু’জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। শের-ই বাংলা মেডিক্যালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। 

তিনি জানান, শনিবার সকাল ৮টায় মারা যাওয়া ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধের বাড়ি নগরীর নিউ ভাটিখানা এলাকায়। ওই বৃদ্ধকে করোনার উপসর্গ নিয়ে ১০ জুন রাত ১টা ১৫মিনিটে তার স্বজনরা করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। ১১ জুন তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ১২ জুন রিপোর্ট পজিটিভ আসে।

শুক্রবার রাতে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আন্দারিয়া গ্রামের ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ওই ব্যক্তিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে শুক্রবার রাত ৮টার দিকে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তির পরপরই তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

একইদিন রাতে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার লেবুখালী এলাকার ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। করোনা উপসর্গ নিয়ে ওই ব্যক্তিকে বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করে স্বজনরা। তার নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ আসে।

 এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নগরীর কাউনিয়ার ৬৫ বছরের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওই ব্যক্তিকে গত শুক্রবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

পরিচালক আরও জানান, এ নিয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে ৩৭ জন এবং করোনা আক্রান্ত ১৭ জনের মৃত্যু হলো।

গোপালগঞ্জ 

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জ‌লিরপার বা‌নিয়ারচর গ্রামে করোনা উপসর্গ নিয়ে রিপন বৈদ্য ওরফে নিপু (৪২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে ঢাকার কু‌র্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যায়।

মুকসুদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান জানান, রিপন বৈদ্যর করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় কয়েক দিন আগে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নমুনা দেন। শনিবার সকালে তার অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যায়। তিনি বা‌নিয়ারচর ক্যাথ‌লিক মিশনের চি‌কিৎসা কেন্দ্রের ল্যাব টেক‌নি‌শিয়ান হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

মৌলভীবাজার 
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সানুর মিয়া (৩০) ও লালই মিয়া (৭৩)। 

জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সানুর মিয়া। তার বাড়ি কমলগঞ্জের আলীনগর ইউনিয়নের চিতলীয়া এলাকার বকসীটিলায়। 

হাসপাতাল ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, সানুর মিয়া গত কয়েকদিন থেকে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। প্রথমে তাকে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার ২৫০শয্যা সদর হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতালের আরএমও ডা. ফয়ছল জামান জানান, মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে লাশ দাফনের জন্য পুলিশ ও পরিবারকে বলা হয়েছে। 

এদিকে শ্রীমঙ্গলের কালাপুর ইউনিয়নের লালই মিয়া নামে এক বৃদ্ধের করোনা নিয়ে উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তিনি ১২-১৩ দিন ধরে শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে ভুগছিলেন। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স টিএইচও সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে লালই মিয়া ও তার স্ত্রীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। রিপোর্ট আসলে বুঝা যাবে।  

নীলফামারী

করোনার উপসর্গ নিয়ে নীলফামারী পৌর শহরের কলেজ পাড়ার সাবদার আলী দেবারুর (৭০) এক ব্যক্তি মারা গেছেন। ৭ জুন তার নমুনা নেওয়া হয়। কিন্তু রিপোর্ট আসার আগেই ১০ জুন নিজ বাড়িতে তিনি মারা যায়।

শনিবার (১৩ জুন) সকালে সিভিল সার্জন ডা. রনজিৎ কুমার বর্মন জানান, এ নিয়ে জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা সাবদারসহ দাঁড়ালো ৬ জনে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০৩। আইসোলেশনের চিকিৎসাধীন রোগি রয়েছেন ১২৪ জন। জেলায় এ নিয়ে সর্বমোট করোনা শনাক্ত হলো ২৩৪ জন।

খুলনা

হাসপাতালে ভর্তির ৩ ঘণ্টা পর করোনার উপসর্গ নিয়ে খুলনায় শুক্রবার রাতে ৬০ বছরের একজনের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম শাহারান বেগম। তার বাড়ি যশোরের বেনাপোলে।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার এবং করোনা সাসপেকটেড আইসোলেশন ওয়ার্ডেও মুখপাত্র ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শাহারান শুক্রবার রাত ৮টার দিকে জ্বর, শাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে রাত ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যাযন। তার নমুনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১০ জুন শারাফাত হোসেন (৫০) নামে খুলনা শহরের একজন জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে খুমেক হাসপাতালের এ ওয়ার্ডে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত একটা ১০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এ পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে ৪০ জনের মৃত্যু হলো।

চট্টগ্রাম

করোনা উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে আরও একজন চিকিৎসক মারা গেলেন। শুক্রবার (১২ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরিফ হাসান নামে ওই চিকিৎসক মারা যান। এ নিয়ে করোনায় ও উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে চার জন চিকিৎসকের মৃত্যু হলো।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক আফতাবুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জাননা, ডা. আরিফের আগে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তারা জানেন না। কারণ এর আগে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আর মারা যাওয়ার পর এখনও নমুনা সংগ্রহণ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়টিও তার জানা নেই।

ডা. আরিফ হাসান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৪৯তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। তিনি নগরীর কোতোয়ালি থানার আবেদিন কলোনি এলাকায় থাকতেন। ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতেন।

আফতাবুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনার উপসর্গ নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে  ডা. আরিফ একটি বেসরকারি  হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে গেলে শুক্রবার তাকে চমেক হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে আনা হয়। সেখানে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার আগেই তিনি মারা যান।’

এর আগে ৪ জুন করোনা আক্রান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মেরন সাইন সিটি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক  ডা. মুহিদ হাসান মারা যান। ৩ জুন এহসানুল করিম নামে আরও এক চিকিৎসক করোনায় মারা যান। আর ঈদের দিন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. এ এম জাফর হোসাইন রুমি মারা যান। 

গাজীপুর

করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গাজীপুরে দুই ব্যক্তি মারা গেছেন। তারা হলেন আব্দুর রহিম (৭০) ও মাঈনুল হোসেন (৫৫)। শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যার পর তাদের মৃত্যু হয়।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান জানান, টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুর এলাকার আব্দুর রহিম গত কয়েকদিন ধরে
জ্বর, সর্দি ও কাশিতে ভুগছিলেন। নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ আসে। অবস্থার অবনতি হলে ৯ জুন তাকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তিনি মারা যান।
এদিকে, টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার মাঈনুল হোসেন করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে আইসিউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তিনি মারা যান।