নদীর পাড়ে বিধ্বস্ত একটা ভবন। অর্ধেক চলে গেছে নদীগর্ভে, বাকিটুকু চলে যাবে হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। সেই ভবনটাকে খানিকটা দূর থেকে তর্জনি দিয়ে দেখিয়ে দিলো দুটো শিশু। একজন বললো, ‘ওইটা ছিল আমাদের স্কুল। কাল নদীতে ভেঙে গেছে। আজ হয়তো পুরোটাই যাবে ।’ পাশের আরেক শিশুর প্রশ্ন ‘এখন আমরা কোথায় পড়বো?’
করোনা সংক্রমনের ভেতরেই এই বাস্তবতা টাঙ্গাইলের নাগরপুরে পাইকশা-মাইঝাইল এলাকায়। গত কয়েকদিনে এখানে যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি। এখানেই গত শনিবার রাতে যমুনার পেটে চলে গেছে নব নির্মিত দোতলা বিশিষ্ট পাইকশা-মাইঝাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভাঙনরোধে এখন পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড বা স্থানীয় প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়েনি তাদের। বারেবারে স্থানীয়দের অনুরোধ সত্ত্বেও ভাঙন থামাতে কিছুই করেনি স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাদের অভিযোগ, একবছর আগে থেকেই নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছিল এই এলাকায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে তখন থেকেই বিষয়টি জানিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছিলেন গ্রামবাসী। কিন্তু, কিছুই করেনি প্রশাসন। অথচ যমুনার এখন যে আগ্রাসী রূপ তাতে এই মূহুর্তে ভাঙনরোধে পদক্ষেপ না নিলে বিলীন হয়ে যাবে পুরো এলাকা।
এদিকে নদীতে বিলীন হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীদের পাঠদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙনরোধে স্থায়ী কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায় অনেকের ঘর-বাড়ি, কৃষি জমি, গাছপালা, কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হতাশায় ভুগছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। এরইমধ্যে এলাকার লোকজন ভাঙন আতঙ্কে তাদের সহায় সম্বল নিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে।
জানা যায়, গত বছর ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার শাহজানী, আটাপাড়া, মারমা, সলিমাবাদ, পাইকশা, দপ্তিয়রসহ কয়েকটি গ্রামে যমুনা নদীর প্রবল ভাঙন দেখা দেয়। ফলে ওইসব এলাকার ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
পাইকশা-মাইঝাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান বলেন, ‘গত বছর বন্যায় এ এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। সে সময় যদি ভাঙনরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো তাহলে আজ আমাদের বিদ্যালয়টি যমুনায় বিলীন হয়ে যেতো না। এখন কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মতো কোনও জায়গাও রইলো না।’
স্থানীয় বাসিন্দা নাগরপুর সরকারি কলেজের সাবেক জিএস শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকেদিনের ভাঙনে এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই ভাঙনরোধে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’