করোনা পরিস্থিতিতেও ‘ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’, বিপাকে ময়মনসিংহের গ্রাহকরা

 

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইয়ের মে মাসের বিদ্যুৎ বিল


‘সরকারের দেওয়া একমাত্র মুক্তিযোদ্ধার ভাতার টাকায় কোনও রকমে চলছে সংসার। করোনার কারণে কোচিংয়ে চাকরি করা ছেলেও বেকার হয়ে তার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সংসারে এসে জুটেছে। অর্থাভাবে সংসার চালানোই এখন দায়। এ অবস্থায় ঘাড়ে চেপেছে মে মাসের ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। জুনের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও হুমকি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কী আর করা, সংসারের চাল-ডাল কেনা বাদ দিয়ে সুদে টাকা নিয়ে বাধ্য হয়ে মে মাসের বিল পরিশোধ করেছি।’

কষ্ট চেপে ক্ষোভের সঙ্গ কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ মহানগরীর মসজিদ রোড কাচিঝুলির বিদ্যুৎ গ্রাহক (মিটার নম্বর-৪৩৮৮৭০) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই। তিনি জানান, গত এপ্রিলে বিদ্যুৎ বিল এক হাজার ৩০০ টাকা আসলেও মে মাসে অনুমান নির্ভর বিলে কারণে তাকে চার হাজার ৫৩৯ টাকা পরিশোধ করতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন একাত্তরের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

শুধু মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই না, জেলার অধিকাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকেরই একই অবস্থা। গ্রাহকদের অভিযোগ, সিস্টেম লসের ঘাটতি পূরণের জন্য ভুতুড়ে বিল করে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। করোনার মধ্যে আর্থিক অবস্থা এমনিতেই খারাপ, এরমধ্যে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

ময়মনসিংহ মহানগীর নওমহল সারদা ঘোষ রোডের আবাসিক গ্রাহক (মিটার নম্বর- ৬০৩৮৫৫) ওয়াহিদুজ্জামান মিলন জানান, মার্চ ও এপ্রিল দুই মাস মিলে একত্রে তার বিদ্যুৎ বিল এসেছে দুই হাজার ৭৫০ টাকা। এই বিল পরিশোধের পর গত মে মাসে একই মিটারে বিদ্যুৎ বিল এসেছে ছয় হাজার ৫৯৩ টাকা। যা জুনের মধ্যে পরিশোধের দিন তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, করোনাকালীন সময়ে ভাড়াটিয়ারা বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বন্ধ বাসাতেও বিদ্যুৎ বিল করা হয়েছে। সংসার চালাতে যেখানে মানুষকে হিমশিমে খেতে হচ্ছে, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের এমন আচরণে মানুষ খুবই বিপাকে পড়েছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের হয়রানি থেকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন মিলন।

তাজুল ইসলামের মে মাসের বিদ্যুৎ বিলময়মনসিংহ সদরের ভাবখালী গ্রামের বিদ্যুৎ গ্রাহক (মিটার নম্বর-১৭৪১৭৯) তাজুল ইসলাম জানান, গ্রামের বাড়ি হওয়ায় ঘরে তিনটি বাল্ব ও দুইটি ফ্যান ব্যবহার করেন। এপ্রিল মাসে ৪৫ ইউনিটের বিল এসেছে ৪২৫ টাকা যা তিনি পরিশোধও করেছেন। কিন্তু পরের মে মাসে মিটারে ২৪৬ ইউনিট ব্যবহার দেখিয়ে বিল করা হয়েছে এক হাজার ৪৩৪ টাকা। এই বিল সংশোধনের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েও কোনও কাজ হয়নি বলে জানান তাজুল। এখন কীভাবে বিল পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চিন্তিত তিনি।

ভুতুড়ে বিলের নামে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত বিল চাপানোর এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগ নেতারাও। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকারের সাফল্য সবেচেয় বেশি। এই সাফল্যকে নস্যাত এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা পরিকল্পিতভাবে চক্রান্তে নেমেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

বিদ্যুৎ অফিসে এসেও ভুতুড়ে বিলের সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেন গ্রাহক তাজুল ইসলামএ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, করোনাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীরা গ্রাহকের বাসায় গিয়ে বিদ্যুৎ বিল করতে না পারায় বিল নিয়ে সমস্যা হয়েছে। গ্রাহকরা তাদের কাছে আসলে অতিরিক্ত বিল সংশোধনের ব্যবস্থা করেন বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ময়মনসিংহ মহানগরীর উত্তর, দক্ষিণ ও শম্ভুগঞ্জ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে আবাসিক, বাণিজ্যিকসহ এক লাখ ৬০ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন।