চেয়ারম্যানের রোষানলে ছয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিযোগ

Jhenidah shailkupa photo 01-10-20 (1)

প্রথমে দেখে মনে হতে পারে এটি কোনও বাগান বা ঘন জঙ্গল। মনে হতে পারে, এখানে হয়তো আবাদ করা হয় সবজি। কিন্তু ঠিক তা নয়, এখানেই এক সময় খেলা করতো শিশুরা। এই স্থানেই পরিবারের নারী সদস্যরা ঘুরে ঘুরে দিন কাটাতেন। কিন্তু এখন সেখানে জঙ্গল। কিন্তু ঘটনা আসলে অন্য। ভাই হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করায় প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যান ও তার বাহিনীর অত্যাচারে গত ছয় বছর ধরে বাড়ি ফিরতে না পারায় বাড়ির উঠানে এখন জঙ্গল সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাড়ির মালিক নাসির উদ্দিন ইদু। এছাড়াও এই হত্যা মামলার সাক্ষী হয়েছিলেন এমন ছয়টি পরিবারেরও একই অবস্থা।

অভিযোগে আরও জানা যায়, আসামি পক্ষ এখন বাদী পক্ষের এসব পরিত্যক্ত বাড়িকে গোয়াল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের বাড়ির উঠানে চরানো হচ্ছে গরু।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া গ্রামের কয়েকটি পরিবারের দুর্দশার চিত্র এটি। তারা জানান, বগুড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়া হয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে জানা যায়, ২০১৪ সালে ২৫ নভেম্বর মাঠ থেকে জালাল উদ্দিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের দিন দুপুরে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় পরদিন নিহতের ভাই নাসির উদ্দিন ইদু বাদী হয়ে শৈলকুপা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর স্থানীয় প্রভাবশালী চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা শুরু করে তাদের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট। হত্যা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের বাড়িতে হামলা চালায় তারা। মামলা তুলে নিতে শুরু হয় হত্যার হুমকি। পরবর্তীতে বাড়ি ছাড়তে হয় বাদী পক্ষকে। মামলার বাদী ইদু, সাক্ষী সায়েম শেখ, কাজী গোলাম নবী, কাজী মোহাম্মদ আলী, কাজী বিল্লাল হোসেন, তানিয়া খাতুন, সাহাবুদ্দিন অত্যাচার সইতে না পেরে বাড়ি ফেলে স্বজনদের নিয়ে পালিয়ে যান। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও তারা বাড়ি ফিরতে পারেনি। সম্প্রতি বাড়িতে ফিরতে চাইলে দেওয়া হচ্ছে হুমকি, মামলা তুলে বাড়ি উঠতে হবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

Jhenidah shailkupa photo 01-10-20 (6)

এ ব্যাপারে মামলার বাদী ইদু বলেন, 'ভাই হত্যার বিচার চেয়ে আজ ছয় বছর বাড়ি ছাড়া আছি। বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করলে চেয়ারম্যান তার লোকজন নিয়ে হামলা চালায়। এমনকি আদালতে সাক্ষী দিতে গেলেও আসামিরা মারধর করতে যায়। বাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা, এখন আদালতে যাওয়ার সাহসই পাচ্ছি না। আমি বাড়ি যেতে পারি বা না পারি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।'

সাক্ষী কাজী মোহাম্মদ আলী বলেন, 'হত্যা মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে এত বছর বাড়ি ছাড়া। বাড়িতে ফিরতে চাইলে চেয়ারম্যান বলছে- আগে মামলা তুলতে হবে, তারপর বাড়ি ফিরতে হবে।'

অপর সাক্ষী কাজী বিল্লাল হোসেন বলেন, 'প্রায় ৩০ বিঘা জমি আর বাড়ি পড়ে আছে আমাদের। বাড়িতে যেতে পারছি না। উপরন্তু আমাদের জমিতে চেয়ারম্যান ফুটবল খেলার মাঠ বানিয়েছেন।'

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করে সাক্ষী সাহাবুদ্দিন বলেন, 'আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, পুলিশ তদন্ত করে রিপোর্ট দিলে সে অনুযায়ী বিচার হবে। আমরা বিচার চাওয়ায় আজ বাড়ি ছাড়া। তাই পুলিশ সুপারসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বলতে চাই- আমরা বাড়ি ফিরতে চাই।'

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, 'হত্যা নিজেরা করে আমাদের নামে মামলা দিয়েছে। মানুষ যখন জানতে পেরেছে, জনরোষের ভয়ে তারা নিজেরাই বাড়ি থেকে পালিয়েছে। আমরা কাউকে মারিনি, কাউকে তাড়াইনি।'

এই প্রসঙ্গে শৈলকুপা থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'ওটা আমাদের কোনও বিষয় না। কে বাড়ি উঠবে না-উঠবে, কে বাড়ি থাকবে না-থাকবে, সেটা তাদের ব্যাপার। এটা আমাদের দায়িত্ব না।'