নরসিংদীতে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই নিজ লোককে হত্যা

 

 

নরসিংদীনরসিংদীর চরাঞ্চলে মাহম্মদ আলী (৩৫) হত্যার দুই বছর দুই মাস পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টগেশন (পিবিআই)। প্রতিপক্ষকে মামলায় ফাঁসাতেই নিজ পক্ষের লোকজন মাহম্মদ আলীকে লোহা ও কাঠ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

হত্যার শিকার মাহম্মদ আলী নরসিংদীর মাধবদী থানার চরাঞ্চলীয় চরদীঘলদী ইউনিয়নের অনন্তরামপুর গ্রামের মো. মোসলেম মিয়ার ছেলে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনন্তরামপুর গ্রামের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিলো। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে আলমগীর, আমির বাদশা ও হারিছ মিয়া এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে রাজা মিয়া, নেওয়াজ আলী ও ফরহাদ।

পূর্ব বিরোধের জের ধরে প্রায়ই দুই পক্ষের লোকজন টেঁটা-বল্লমসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় পক্ষে-বিপক্ষে প্রায় এক ডজন বিচারাধীন মামলা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট (কোরবানির ঈদের আগের দিন) সকাল ৬টার দিকে আলমগীর পক্ষের লোকজন তার পক্ষের বারেক মিয়ার বাড়িতে দলীয়করণ ও কোরবানি সংক্রান্ত মিটিং করছিল। মিটিং চলাকালে প্রতিপক্ষ রাজা মিয়ার লোকজন তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে উভয় পক্ষের অর্ধশত লোকজন আহত হয় এবং হামলার শিকার লোকজন বিভিন্ন ঘরে লুকিয়ে থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। এসময় ভিকটিম মাহম্মদ আলী এবং আব্দুর রহমান, আমীর বাদশা, ইউনুস আলী, শাহ আলমগণ বারেক মিয়ার ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেন।

বিপক্ষের লোকজন বারেকের ঘরের সামনে এসে চিৎকার করে আলমগীর পক্ষের লোকদের খোঁজ করে। তাদের ভয়ে বারেকের ঘরে লুকিয়ে থাকা আমির বাদশা, আব্দুর রহমান, ইউনুস আলী এবং ভিকটিম মাহম্মদ আলী উক্ত ঘরের সিলিংয়ের ওপর উঠে। একপর্যায়ে মারামারি থামলে ও প্রতিপক্ষের লোকজন চলে গেলে বারেকের ঘরে লুকিয়ে থাকা আহত সবাই বেরিয়ে আসে। সবাই কান্নাকাটি করে প্রচার করে প্রতিপক্ষের রাজা গ্রুপের লোকজন মাহম্মদ আলীকে হত্যা করেছে। খবর পেয়ে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং মাহম্মাদ আলীর মৃত দেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে নিহত মাহম্মদ আলীর ভাই বাদশা বাদী হয়ে রাজা মিয়া গ্রুপের ৫৩ জন ও অজ্ঞাত ১০/১৫ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় আমীর বাদশাকে জখমি সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে মাধবদী থানায় দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে নারাজির ভিত্তিতে মামলাটি পিবিআই নরসিংদীতে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৮ জুলাই পিবিআই নরসিংদী জেলা তদন্তভার গ্রহণ করে হত্যার প্রকৃত রহস্য ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্তে নামে।

হত্যার ঘটনাস্থল বারেকের ঘরের সিলিংয়ের ওপরে ঘটনার সময় যারা উপস্থিত ছিল তাদের খোঁজা হলে রহস্যের গন্ধ পায় পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা। মামলায় উল্লেখিত সাক্ষী এবং স্থানীয় দলের নেতৃত্বদানকারী আমির বাদশাসহ শাহ আলম ও আব্দুর রহমানদেরকে কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার আসল বিবরণ বেরিয়ে আসে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে গ্রেফতারের পর আমির বাদশা নিজ দলকে জেতানোর জন্য এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ভিকটিম মাহম্মদ আলীকে লোহা ও কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে স্বীকার করে। হত্যাকারী আমির বাদশা ও প্রত্যক্ষদর্শী দুই জন সাক্ষীসহ মোট তিন জন বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।