দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আশুরার বিলে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ ও ফসলি জমি রক্ষার দাবিতে ১০ দিন ধরে আন্দোলন ও অনশন কর্মসূচি পালন করছেন স্থানীয় কয়েকশ’ কৃষক পরিবার। এলাকার কৃষকদের দাবি, সরকার অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করায় প্রায় ১৯শ’ হেক্টর জমিতে গতবছর জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এসব জমির ৯ ভাগের এক ভাগ সরকারের। বাকি জমিতে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করতে পারছেন না। তাই এই বিলে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এদিকে এলাকাবাসীর অনশনের ১০ দিন অতিবাহিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও কর্মকর্তা সেখানে যাননি এবং তাদের সাথে কথা বলেননি। বাধ্য হয়ে নিজেদের ধানি জমি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকার কৃষকসহ স্থানীয়রা।
এদিকে ১০ দিন ধরে কৃষকদের অনশন কর্মসূচি পালনকালে ৭ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এরইমধ্যে অনশনে বসে অসুস্থ হওয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গোলাপ সরকার নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। আর বর্তমানে অসুস্থ রয়েছেন- সিরাজুল ইসলাম, গফুর আলী, আইজুল ইসলাম, দিলবার আলী ও সাদেক আলী।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত বছরে আশুরার বিল এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে প্রশাসন। এর ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ওই এলাকার সরকারিসহ আশেপাশের প্রায় ১৯শ হেক্টর জমি ডুবে যায়। সাধারণ মানুষ হারায় তার একবছরের ফসল।
ওই এলাকার একজন উন্নয়ন কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, জমির পরিমাপ অনুসারে ১ হেক্টর সমান ২ দশমিক ৪৭১ একর। ফলে এই ১৯শ’ হেক্টর অর্থ হচ্ছে ৪ হাজার ৬শ’ ৯৫ একর জমি। নবাবগঞ্জের ইউএনওর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখানে ৫৮৮ একর জমি সরকারের। ফলে সরকার প্রকল্প গড়ে নিজের জমিতে পানি রাখতে না পারায় জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে বাকি ৪ হাজার ১১০ একর জমি যার মালিক সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, গণমানুষের ক্ষতি করে এই বাঁধ দেওয়া কতটা যৌক্তিক হচ্ছে তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। কারণ, সরকার তার খাস জমির ওপর প্রকল্প করতে গিয়ে এর আশেপাশের আরও ৮ গুণ ঊর্বর জমির উৎপাদন নষ্ট করতে পারে না। তবে স্লুইস গেট বা অন্য কোনও উপায়ে যদি এই পানি নিষ্কাশনের রাস্তা করা সম্ভব হয় তাতে হয়তো এই জলাবদ্ধাতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
স্থানীয়রা বলছেন, উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকবার এই বাঁধ খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হলেও প্রশাসন কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তবে বাঁধটি টেকেনি একবছরও। এবারের ভারী বর্ষায় বাঁধটি ভেঙে পানি নিষ্কাশন হয়ে যাওয়ায় আবারও আবাদের উপযোগী হয়ে উঠেছে জমিগুলো। কিন্তু, আবারও সেই বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
স্থানীয়রা বলছেন, বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করা হলে এবারও জমিগুলোতে জলাবদ্ধতা হবে। ফলে ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন হবে না। তাই ওই এলাকার প্রায় ২ হাজারেরও অধিক পরিবারের সদস্য বাঁধ নির্মাণের স্থানে বসে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।
তবে সরকারের একটি সূত্র বলছে, সাধারণ মানুষের জমির পাশাপাশি সরকারি জমিগুলোও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর দখলে চলে যায়। তারা সেগুলো চাষ করলেও সরকার কিছুই পায় না। তাই সরকার বাঁধের বিষয়ে সিদ্ধান্তে গেছে। তবে এ বছন পরিসংখ্যানকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার।
রবিবার দুপুরে অনশনের স্থানে কথা হয় প্রায় ৬৫ বছর বয়সী মনতাজ আলী সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই বিঘা জমি আবাদ করতে পারছি না। এ কারণে পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছি। এখন আবারও এই বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। আমরা আর এই বাঁধ নির্মাণ করতে দেবো না। কারণ বাধ নির্মাণ করলে এবারও আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
অনশনে অংশগ্রহণ করা নবাবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর তালতলা এলাকার জমির উদ্দিন বলেন, আশুড়ার বিলে আমার কৃষি জমি আছে। সেগুলো আবাদ করে সংসার চালাই। গত বছরে এখানে একটি বাঁধ নির্মাণ হয়। তার জন্য আমার জমিতে পানি জমে। এক বছর আমরা আবাদ করতে পারি নাই। এবারে প্রবল বর্ষণে সেটি ভেঙে গেছে। তাই আবারও জমিতে আবাদ করে সোনার ফসল ফলিয়ে সংসার চালাতে চাই। আমার দুই ছেলে। এক ছেলে মাস্টার্স, এক ছেলে ইন্টার ও মেয়েটি এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আমরা অনেক কষ্টে আছি। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারছি না। আমরা অবস্থান নিয়েছি যে এটি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে সরে যাবো না। এই জমিতে আবাদ করতে না পারলে আমরা না খেয়েই মারা যাবো।
মমতা বেগম নামের এক নারী বলেন, আমরা ১০ দিন থেকে জমির জন্য খেয়ে না খেয়ে এখানে অবস্থান করছি। ঘরেও ভাত নেই। এই জমি চাই। এখানে আমরা মাছ চাষ চাই না। এই জমির খাস ও খড় দিয়েই আমাদের গরু-ছাগলের খাবার হয়। এই জমির আবাদ দিয়েই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাই ও সংসার চালাই। সরকার পতিত জমি না রাখতে বলেছে, অথচ এখানে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদনের জমিগুলোতে ইচ্ছা করে জলাবদ্ধতা বানানো হচ্ছে। আমরা আর তা হতে দেবো না।
জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাজমুন নাহার বলেন, অনশন কিনা সেটি বলতে পারছি না। আমার জানা মতে কিছু মানুষ প্রতিদিন বাসা থেকে খেয়ে দেয়ে অবস্থান নিয়েছে। সরকারের জমিতে ধান চাষ করবে এটি তাদের দাবি। কিন্তু এগুলো সরকারি জমি, সরকার ধান চাষ করবে না কী কাজে লাগাবে সেটি তো সরকারের সিদ্ধান্ত। যেহেতু সেখানে কোনও কাজ করছি না, আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কোনও কিছু ঘটেনি। শুধু কিছু মানুষ অবস্থান নিয়েছে, আমরা কাজ করলে যদি বাধা দিতো তাহলে যেতাম। এখনও যাওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। এই বাঁধ নির্মাণ করলে সরকারের কী ধরনের লাভ হবে এখনও সেই পরিসংখ্যান করা হচ্ছে। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, পরিসংখ্যানের কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আশেপাশে ব্যক্তি মালিকানার সম্পত্তি থাকতে পারে, সেজন্য পরিসংখ্যান করা হচ্ছে। এখানে এখন আমরা স্লুইসগেইট করতে চাচ্ছি। এই বিলে সরকারের প্রায় ৫৮৮ একর জমি রয়েছে। আবাদি জমি এর চেয়ে বেশি আছে বলে আমার জানা নাই। পাবলিক জমির কথা বলছি না, সরকারি জমির কথা বলছি।