এমন বিষাদমাখা ভোর কখনও আসেনি বারেক বাজার ও বালিয়াদীঘি এলাকায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের বারেক বাজার ও শাহাবাজপুর ইউনিয়নের বালিয়াদীঘি এলাকায় এক দুর্ঘটনায় এক নিমিষে সাতজন ও পরে মোট ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা এলাকার মানুষদের তাড়িয়ে বেড়াবে দীর্ঘদিন। সাত সকালে অনাকাঙ্ক্ষিত এমন মৃত্যুর মিছিলের সংবাদে শোকে স্তব্ধ পুরো এলাকা। একসঙ্গে এত মৃত্যুর শোক সইতে পারছেন না নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশীরাও।
নিহতদের ৬ জনের বাড়ি শাহাবাজপুর ইউনিয়নের বালিয়াদীঘি ও ২ জনের বাড়ি ধনিপাড়ায় ও একজনের বাড়ি কলোনি পাড়ায়। বরেন্দ্র এলাকা থেকে ধান কেটে বাড়ি ফেরার পথে আজ বৃহস্প্রতিবার ভোর ছয়টার দিকে বারেকবাজার এলাকায় ধানবোঝাই একটি ট্রলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পাশের খাদে পড়ে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। পানিতে পড়ে আর বস্তার নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৭ শ্রমিকের। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও ২জন। গুরুতর আহত অবস্থায় ৪ চারজনকে ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর বাকি ৩ জনকে এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সঙ্গীদের মৃত্যুর দুঃসহ স্মৃতি।
সরেজমিন জানা যায়, নিহতদের কেউ ছিলেন খণ্ডকালীন আবার কেউ ছিলেন পেশায় শ্রমিক। ৭৩ কিলোমিটার দূরে বরেন্দ্র জেলা নওগাঁয় ১৫ জন শ্রমিক হিসেবে ধান কাটতে গিয়েছিলেন একসাথে। বাড়ি পৌঁছার দুই কিলোমিটার অদূরে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলেসহ প্রাণ হারান ৯ জন। যাদের মধ্যে আবার কয়েকজনের বিয়ে হয়েছিল কয়েকমাস আগে। ধান নিয়ে ফিরলেও, ফেরেনি তাদের প্রাণ। স্বজনদের আহাজারিতে দেখতে যাওয়া মানুষদের চোখেও নেমে আসে অশ্রুধারা। অতীতে একসঙ্গে এত মৃত্যু এলাকাবাসী কখনোই দেখেনি। তাই মৃত্যুর এ মিছিল মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
এদিকে, অনাগত সন্তানের মুখটিও দেখতে পারলেন না ধনিপাড়া গ্রামের মিজানুর রহমান। সড়ক দুর্ঘটনায় যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে তিনিও একজন। স্বামীকে হারিয়ে এখন পাগল প্রায় ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমিনা বেগম। শোক নেমে এসেছে পুরো পরিবারে। আমিনা বেগম বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিকে জানান,‘আমি ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী মারা যাওয়ায় আমি অসহায় হয়ে গেলাম। আমার অনাগত সন্তানের এখন কি হবে? আর পরিবারের একমাত্র সন্তান হারিয়ে মিজানুরের বাবা-মা মূর্চ্ছা যাচ্ছেন।
একই চিত্র পাশের বাড়ির আহাদ আলীর পরিবারেও। চারমাসে বিয়ে করেছিলেন তিনিও। সংসার জীবন শুরু করতেই না করতেই স্বামীর এমন মৃত্যুতে স্তব্ধ তার স্ত্রী আসমা খাতুন। শোকে পাথর আসমা পারেননি কোনও কথা বলতে। শুধুই ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়েছিলেন চাদরে ঢাকা স্বামীর মরদেহের দিকে। আর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মার আর্তনাদে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মুখেও ছিল না কোনও সান্ত্বনার ভাষা।
বালিয়াদীঘি গ্রামের বাবা তাজামুল হক ও ছেলে মিঠুন কে হারিয়ে পরিবারটিতে চলছে এখন শোকের মাতম। মাঝে মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন বউ-শাশুড়ি। কেউই মেনে নিতে পারছেন না এমন মৃত্যু। পরিবারের দুই সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারটি। মিঠুনের দুই সন্তানের একজনের বয়স ৩ বছর এবং আরেকজনের বয়স ৮ মাস। তাদের মৃত্যুতে উর্পাজন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছোট দুটো বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের মতো চিন্তিত এলাকাবাসীও।
মিঠুনের স্ত্রী আশা জানান,‘তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্বামী-সন্তানদের নিয়ে তাদের ছিল সুখের সংসার। কিন্তু এ দুর্ঘটনা তাদের সবকিছু ওলোট-পালট করে দিলো। তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই প্রশাসন কিছু সহায়তা করলেও; পরে আর কেউ খোঁজ নেবে না। তিনি তার পরিবারকে চালিয়ে নিতে উপার্জনের একটা ব্যবস্থা করে দিতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।’
তবে শোকাহত গ্রামবাসী এ ঘটনার জন্য সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙা রাস্তা এবং অতিরিক্ত ধান লোডকেই দায়ী করেছেন। এ ঘটনায় তাদের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ওপর।
স্থানীয় যুবলীগ নেতা আলমগীর কবির জানান,‘তারা একাধিকবার চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বারের কাছে রাস্তাটি সংস্কারে আবেদন করেও কোন ফল পাননি।’
একই এলাকার জোবদুল হক জানান,‘এর আগে এ এলাকায় কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটার পরও জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের টনক নড়েনি।’ তার প্রশ্ন, আর কত লাশ পেলে রাস্তাটি সংস্কার হবে? আর কত লাশের বিনিময়ে সড়কে এসব লাইসেন্সবিহীন অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ হবে?
এদিকে, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। তারা উদ্ধার করেন ধানের বস্তার নিচে থাকা নিহতদের মরদেহ। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা। পরে তাদের উপস্থিতিতে নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন এবং এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেন জেলা প্রশাসন।
বিকেল পৌনে তিনটায় বালিয়াদীঘি গণকবর গোরস্থানে একসঙ্গে জানাজা শেষে নিহতদের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসননের কর্মকর্তারা ও কয়েক হাজার এলাকাবাসী অংশ নেন।
নিহতরা হলেন শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের সোনামসজিদ বালিয়াদীঘি গ্রামের নওশাদ আলীর ছেলে আবুল কাশেম, তাজুলের ছেলে অয়ন, তাজামুল হক ও তার ছেলে মিঠুন, রেহেমানের ছেলে আতাউর রহমান, মজিবুরের ছেলে কনক মাসুদ, ধনিপাড়া গ্রামের আজিজুলের ছেলে আহাদ আলী, আমানুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান ও মুন্তাজুল ইসলামের ছেলে সেমদাদুল ইসলাম বাবু।