ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা মামলার বিচারকাজ শুরু




ঘোড়াঘাট ইউএনওদিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলার ঘটনায় মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) মামলার বিচারিক কার্যক্রমের প্রথম ধার্য তারিখে আসামির উপস্থিতিতে চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয় ২৯ ডিসেম্বর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দিনাজপুর আদালত পুলিশ পরিদর্শক ইসরাইল হোসেন ও দিনাজপুর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) শাহ্ দোরখ শান্ (এডমিরাল)।

আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) শাহ্ দোরখ শাহ্ বলেন, আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের প্রথম ধার্য তারিখে দুপুরে আসামি রবিউল ইসলামকে দিনাজপুরের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এসময় আসামি রবিউলের আইনজীবী শহীদুর রহমান জামিনের আবেদন করলে আদালতের বিচারক বিশ্বনাথ মন্ডল জামিন নামঞ্জুর করেন। একইসঙ্গে আগামী ২৯ ডিসেম্বর তারিখে মামলার চার্জ গঠনের জন্য দিন ধার্য করেন। পরে আসামিকে পুনরায় জেলহাজতে পাঠানো হয়।

এর আগে আমলি আদালত-৭-এ (ঘোড়াঘাট) মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা সমস্ত নথিপত্র আদালতে জমা দেন। পরে দিনাজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি বিচারিক কার্যক্রম ও নিস্পত্তির জন্য বিচারিক আদালত-২, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠান।

দিনাজপুর আদালতের পুলিশ পরিদর্শক ইসরাইল হোসেন বলেন, ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলার ঘটনায় একমাত্র আসামি রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ২১ নভেম্বর দিনাজপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি আদালত-৭) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি ইমাম আবু জাফর।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার সবদিক বিবেচনা করে এবং নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনার একমাত্র পরিকল্পনাকারী এবং হামলাকারী আসামি রবিউল ইসলাম। এজন্য তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ৪৫৭/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৫০৬(২)/৩৮০/২০১ পেনাল কোডের ধারা উল্লেখ করা হয়। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্য যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো ঘটনার সঙ্গে কোনও সম্পৃক্ততা না থাকায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিযোগপত্রে মামলার সিসি ফুটেজ পর্যালোচনা, মোবাইল নেটওয়ার্ক, আলামত হিসেবে ব্যবহৃত লাঠি, হাতুড়ি, ফরেনসিক রিপোর্ট, এমইরিপোর্ট, নোকিয়া ফোন, নগদ ৪৫ হাজার টাকাসহ ৩১টি আলামত থাকার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও অভিযোগপত্রে ৫৩ জনকে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। এদের মধ্যে পাঁচ জন সাক্ষী ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলায় প্রায় পৌনে ৩ মাসের সময়ে ৪০ জনেরও বেশি জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামি রবিউল ইসলাম জেলা প্রশাসকের ফরাস পদে চাকরি করতেন। এই চাকরিরত অবস্থায় সে আইপিএল ক্রিকেট জুয়া, বাজি ধরায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে এইসব নেশায় পরিণত হওয়ায় কাজে মনোযোগ দিতে পারতেন না। এতে তাকে কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হতো। এরই ধারাবাহিকতায় কাজে অবহেলা ও উদাসীনতার জন্য তাকে শাস্তিস্বরুপ ঘোড়াঘাটে বদলি করা হয়। সেখানেও রবিউল ইসলাম জুয়া, বাজি ধরার জন্য ঋণ ও দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সেখানে পাওনাদারদের টাকার চাপে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পারায় গত ৯ জানুয়ারি তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যাগ থেকে ১৬ হাজার টাকা চুরি করে। পরে চাকরির কোনও ক্ষতি হবে না এই শর্তে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন রবিউল।

এরপরেও রবিউলের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ করা হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আইপিএল জুয়াসহ বাজি ধরায় অভ্যস্থতার কারণে আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্ত হওয়া, ইউএনওর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করার ফলে জরিমানা প্রদান, রবিউলের অপেশাদারিত্বের জন্য বিভাগীয় মামলাসহ সাময়িক বহিষ্কার করা এবং পরে তাকে চাকরিচ্যুত করা ও পারিবারিকভাবে অশান্তির কারণে রবিউল এই হামলার ঘটনার পরিকল্পনা করে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর দিনগত রাত ২টার দিকে সরকারি ডাকবাংলোতে ঘোড়াঘাট ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টায় তাদেরকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে দুপুর ১টায় হেলিকপ্টার যোগে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ভাই শেখ ফরিদ বাদী হয়ে ঘোড়াঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১১ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার বিরল উপজেলার বিজোড়া ইউনিয়নের বিজোড়া গ্রামের খতিব উদ্দীনের ছেলে ও ঘোড়াঘাটের ইউএনও বাসভবনের সাবেক কর্মচারী রবিউল ইসলামকে আটক করা হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রবিউল। পরে মামলার সিসি ফুটেজ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফরেনসিক রিপোর্ট, ব্যবহৃত হাতুড়িসহ ৩১টি আলামতের মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে এই ঘটনার সঙ্গে একমাত্র রবিউল ইসলামই জড়িত।

 

আরও পড়ুন:
ইউএনও ওয়াহিদার ওপর একাই হামলা করে সাময়িক বহিষ্কৃত মালি রবিউল!

ইউএনও ওয়াহিদার বাসায় টাকা ছিল ৪০ লাখ, রবিউল নেয় ৫০ হাজার!

‘ইউএনও ওয়াহিদার প্যারালাইজড ডান সাইডের রেসপন্স জিরো’