অধ্যক্ষ হবিবুর রহমানের বিদায়ী সংবর্ধনায় লিটন

রাজশাহীকে বিশাল শিক্ষানগরী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, ‘রাজশাহীতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। রাজশাহী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজশাহীকে এক বিশাল শিক্ষাযজ্ঞের নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।’ বুধবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমানের অবসরোত্তর বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন মেয়র। রাজশাহী কলেজ শিক্ষক পরিষদের দিনব্যাপী নানা আয়োজনে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘এ মানুষটির কারণে এক সময়ের অবিভক্ত বাংলার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ পরপর চারবার বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষাসহ সবদিক দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে ঝকঝকে তকতকে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের মাঝে হানাহানি কিংবা বিদ্বেষ নেই। এ মানুষটির কারণে এখানকার ছাত্রছাত্রীর মাঝে ভাইবোনের পবিত্র সম্পর্ক বিদ্যমান। সেই মানুষটি যখন তার শেষ কর্মদিবস পালন করেন এবং তাকে নিয়ে সহকর্মীরা অন্তর থেকে যাই বলুন, তা কম হবে।’

সিটি মেয়র আরও বলেন, ‘আমি তাকে নানাভাবে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করেছি। বাংলাদেশে যদি হাজার খানেক হাবিবুর রহমান থাকতো তবে দেশ আরও অনেক এগিয়ে যেতো। কারণ সারা বাংলাদেশে তো হাজার হাজার প্রফেসর আছেন, তাদের মধ্যে ভালোও অনেকে আছেন। তবে সবদিক মিলিয়ে এত গুণের সমাহার, নান্দনিক ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি কয়জনের আছে? তিনি একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের কাছে পিতৃতুল্য অন্যদিকে অভিভাবক হিসেবে প্রয়োজনীয় কড়া ব্যবস্থা নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা রাজশাহী কলেজে আরও কিছু বছর তাকে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে বাধা পেয়েছি। কেননা এমনটা হলে এটাকেই সারা বাংলাদেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করানো হবে। তবে আমি নিশ্চিত এমন একটা কর্মবীর মানুষকে বসিয়ে রাখা যাবে না। সুতরাং তাকে সম্মান জানিয়ে তার মেধাকে দেশের জন্য কাজে লাগাতে হবে। কেননা তিনি দেশকে ভালোবাসেন তিনি দেশকে কিছু দিতে পারবেন। ’

এ সময় অধ্যক্ষকে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘আমার দল যতদিন ক্ষমতায় আছেন ততদিন পর্যন্ত আপনাকে যথোপযুক্ত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যেও শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন করার লক্ষ্য আমাদের আছে। রাজশাহীতে দেশের স্বনামধন্য বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আসছে। হলিক্রসের পূর্ণাঙ্গ একটি শাখা রাজশাহীতে উদ্বোধন করা হয়েছে। নটরডেমসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছি।’

অনুষ্ঠানে রাজশাহী কলেজ উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্যে রাখেন– রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. তানভীরুল হক, শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. জুবাইদা আয়েশা সিদ্দীকা, রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. গোলাম কবীর, মাউশির সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. ইলিয়াস হোসেন, বিদায়ী অধ্যক্ষের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ।

এ সময় বিদায়ী অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘যেকোনও কাজের প্রতিই ভালোবাসা, সততা, স্বচ্ছতা থাকতে হয়। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, রাজশাহী কলেজে সার্বিক উন্নতির জাদুটা কী? আমি এক কথায় বলি, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের ইতিবাচকভাবে বদলে যেতে দেখেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের সুযোগ করে দিয়েছি, প্লাটফরম তৈরি করে দিয়েছি। যা অনেক প্রতিষ্ঠানই পারেনি। প্রধানমন্ত্রী বলে থাকেন, আমি পারি, আমরা পারি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এর মধ্যেই কাজ করে যেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন শাসন করেছি, তেমনি অন্তর থেকে ভালোবেসেছি। তাদের সঙ্গে আমার যে বন্ধন তা কখনও ছিঁড়বে না। এরমধ্যে দিয়েই কলেজের অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি আমি চলে গেলেও এ কলেজের পরিবেশ এমনই থাকবে। রাজশাহী কলেজ আমার প্রাণ।’

এর আগে সকালে অধ্যক্ষকে গার্ড অব অনার প্রদান করে রাজশাহী কলেজ বিএনসিসি ইউনিট ও রোভার স্কাউট। অনুষ্ঠানের শুরুতে রাজশাহী কলেজের সহশিক্ষা সংগঠনসহ বিভাগগুলো ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। বেলা ১১টার দিকে প্রামাণ্যচিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের শেষে প্রজন্মের পথিকৃৎ অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

উল্লেখ, রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। শতবর্ষ অতিক্রম করা কলেজটি জুড়ে অনেক স্মৃতি রয়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে কলেজটির আছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে পর পর চারবার বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। বিদায়ী অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমানের সময়ে দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জন করে।

কলেজটি অতীত গৌরবের ধারা অব্যাহত রেখেছে। কলেজটির সেই প্রাচীন ভবনগুলো আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু বছর বছর আগমন ঘটেছে নতুন অতিথির। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠানে বিএ কোর্স চালু হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে এখানে বিএ কোর্স চালু করা হলে উত্তরবঙ্গের সর্বপ্রথম এবং পরবর্তীকালে সর্বশ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে পরিচিতি পায় কলেজটি। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে কলেজে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়।