বগুড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার অভিযোগে এক ভোটারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতিসহ ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত তাদের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীর্ঘ ১৯ বছর পর সোমবার দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে বগুড়া প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হাবিবা মণ্ডল এ রায় দেন।
আসামিদের মধ্যে তিন জন পলাতক রয়েছেন; গ্রেফতারের পর তাদের সাজা কার্যকর হবে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এপিপি নাছিমুল করিম হলি এ তথ্য দিয়েছেন।
এদিকে ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ মৃধাসহ কয়েকজন দলীয় নেতাকর্মীকে সাজা দেওয়ায় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, এ রায় সাজানো। চারবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় চেয়ারম্যান রশিদ মৃধাসহ সাজাপ্রাপ্ত অনেকের বিরুদ্ধে কোনও সাক্ষী ছিল না। তিনি অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।
সাজাপ্রাপ্তরা হলেন– বগুড়া সদর উপজেলার শেখেরকোলা ইউনিয়নের মহিষবাথান গ্রামের হবিবর রহমানের ছেলে বিপ্লব মিয়া, একই গ্রামের আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার ছেলে রাসেল, মৃত বাচ্চু প্রামাণিকের ছেলে জুয়েল প্রামাণিক, মহিষবাথান গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে শেখেরকোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রশিদুল ইসলাম ওরফে রশিদ মৃধা, দক্ষিণভাগ গ্রামের আলমগীর হোসেন আকন্দের দুই ছেলে সবুজ আকন্দ ও উজ্জ্বল আকন্দ, মাহতাব আকন্দের ছেলে আবদুল মান্নান, রওশন আলী খন্দকারের ছেলে পিলু খন্দকার, মৃত তমিজ উদ্দিনের ছেলে মোখলেছার রহমান মুকুল, কলিম উদ্দিন আকন্দের ছেলে আবদুল হামিদ খোকা আকন্দ এবং মৃত আফসার আলীর ছেলে জাহেদুর রহমান। তাদের মধ্যে বিপ্লব, রাসেল ও জুয়েল জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছেন।
মামলা ও আদালত সূত্র জানায়, গত ২০০৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়া সদর উপজেলার শেখেরকোলা ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চেয়ারম্যান পদে আবদুস সাত্তার খাঁ ও বিএনপি নেতা রশিদুল ইসলাম ওরফে রশিদ মৃধা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলাফলে রশিদ মৃধা জয়লাভ করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি রশিদ মৃধা দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একপর্যায়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তারা দক্ষিণভাগ গ্রামে পৌঁছলে মৃত তমিজ উদ্দিনের ছেলে শাহজাহান আলী এবং মৃত আজিমুদ্দিনের ছেলে আবদুল মান্নানের সঙ্গে দেখা হয়। তখন রশিদ মৃধা তাকে ভোট না দেওয়ায় অভিযোগ তুলে তাদের ওই দুজনকে গালিগালাজ করেন ও হুমকি দিন। এরপর রশিদের নির্দেশে অন্য আসামিরা লোহার রড ও লাঠিসোঁটা দিয়ে শাহজাহান আলীকে বেদম মারপিট করে ফেলে যান। গুরুতর আহত শাহজাহানকে উদ্ধার করে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে তিনি মারা যান। এ ব্যাপারে তার ভাই মাহমুদুর রহমান সদর থানায় রশিদ মৃধাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। গ্রেফতারের পর ১১ আসামি জামিনে ছাড়া পান। সদর থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোস্তাফিজুর রহমান ৩ জুন আদালতে রশিদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এপিপি নাছিমুল করিম হলি জানান, মামলায় আদালত মোট ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ ১৯ বছর পর সোমবার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হাবিবা মণ্ডল এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় রশিদ মৃধাসহ আট জন উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতারের পর পলাতক তিন আসামির সাজা কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট আবদুল বারী আকন্দ ও জাহাঙ্গীর হোসেন মামলা পরিচালনা করেন।