৩৫ বছর পর ঐতিহ্যবাহী মই খেলা, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

চিরাচরিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রায় ৩৫ বছর পর কুড়িগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী ‘মই খেলা’। মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে জেলার সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের সোনালী কুটি গ্রামে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। খেলা দেখতে দুপুরের পর থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু সোনালী কুটি গ্রামে ভিড় করেন। গ্রামীণ এ খেলায় নারী ও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল অভূতপূর্ব।

মঙ্গলবার দুপুরে ঘোগাদহ ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, হারিয়ে যাওয়া এ খেলা দেখতে জেলার দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর আয়োজনস্থলের দিকে ছুটছেন। কেউ রিকশায়, কেউ মোটরসাইকেলে আবার কেউবা পায়ে হেঁটে সোনালী কুটি গ্রামের দিকে ছুটছেন। জমির আল ধরেও নারী পুরুষ ও শিশুদের খেলার মাঠের দিকে যেতে দেখা গেছে।

আয়োজকরা জানান, প্রতিবছর বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিকে কিংবা মাঘ মাসের শুরুতে যখন জমি ফাঁকা হতো তখন এই মই খেলা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলে আর এই খেলা হয় না। এলাকার প্রবীণদের মুখে এই মই খেলার গল্প শুনতে শুনতে সোনালী কুটি গ্রামের যুবকরা পুরনো ঐতিহ্য বর্তমান প্রজন্মকে উপলব্ধি করাতে গ্রামের ফাঁকা কৃষিজমিতে ‘সোনালী কুটি যুব সমাজ’ নামে এই মই খেলার আয়োজন করেন।

ঐতিহ্যবাহী ‘মই খেলা’খেলায় মোট ছয়টি দল অংশ নেয়। জামালপুর জেলা থেকে আসা ছয়টি দল তাদের গরু ও মই নিয়ে খেলায় অংশ নেয়। ফসল তুলে নেওয়া ফাঁকা কৃষিজমিতে ৩২০ গজ দূরত্বে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মই সমেত গরু নিয়ে পৌঁছাতে হয়। জমিতে মই দেওয়ার মতো করে এ দৌড় প্রতিযোগিতায় মইয়ে চড়ে আগে পৌঁছাতে পারলেই সেই দল বিজয়ী। দুই পর্বের খেলায় প্রথম হন হাবু ব্যাপারীর দল। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন মোজাহারুল ইসলামের দল এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে রতন ব্যাপারীর দল। মই খেলায় বিজয়ীদেয় জন্য প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি গরু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার দেওয়া হয় একটি করে খাসি। আর চতুর্থ স্থান অধিকারীকে দেওয়া হয় প্রাইজ মানি। খেলা শেষে সন্ধ্যার আগেই বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

৩৫ বছর পর মই খেলা উপভোগ করতে পেরে খুশি স্থানী এবং জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। স্থানীয় স্কুল শিক্ষার্থী দোলন বলেন, ‘আমি ভাবতে পারিনি এই খেলা আমি কখনও দেখতে পারবো! বন্ধুরাসহ এই খেলা দেখতে এসেছি। এখানে এসে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমি খুব আনন্দিত। আয়োজকদের অনেক ধন্যবাদ।’ একই অনুভূতি ব্যক্ত করেন স্কুল শিক্ষার্থী ইভা ও লিতুন।

জমিতে মই দেওয়ার মতো করে এ দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু।

ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে আমাদের এ ঐতিহ্যবাহী খেলাটি বন্ধ ছিল। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার কারণে মানুষ এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা ভুলে যাচ্ছে। আমার এলাকার মানুষদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন করেছি।’