টেকনাফে অপহরণ করে তিন জনকে হত্যা

‘ওসির হাতে-পায়ে ধরেও আমার স্বামী জিডি করতে পারেননি’

কক্সবাজারের টেকনাফে বেড়াতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন তিন বন্ধু ইমরান, রুবেল ও মোহাম্মদ ইউসুফ। অপহরণের পর মুক্তিপণের টাকার জন্য পরিবারের কাছে একাধিকবার মোবাইল ফোনে নির্যাতনের কথা বলার পরও মুক্তিপণ পায়নি অপহরণকারীরা। এ কারণে হত্যা করা হয় তিন জনকেই। এদিকে, এ ঘটনায় টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওসি আব্দুল হালিম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে।

নিহত ইমরানের মা হামিদা বেগম পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ করে বলেন, ‘টেকনাফ থানার ওসি আব্দুল হালিমের হাতে-পায়ে ধরেও আমার স্বামী একটি জিডি করতে পারেননি। মুক্তিপণের টাকার জন্য চাপ দেওয়া অপহরণকারীদের একাধিক মোবাইল ফোন নম্বর পুলিশকে দেওয়া হলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। ওই সময় পুলিশ চাইলে তিনটি তাজা প্রাণ রক্ষা করতে পারতো। কিন্তু, ওসি আব্দুল হালিম তা করেননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেসহ তিন জন অপহরণের পর জিডি করতে প্রথমে কক্সবাজার সদর থানায় গেলে তারা টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে পাঠান। পরে টেকনাফ থানায় গেলে ওসি আব্দুল হালিম জিডি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এভাবে গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সুরাহা হয়নি। শেষে আমার ছেলেসহ তিন জনকে জীবন দিতে হলো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে।’

আক্ষেপ করে হামিদা বলেন, ‘আমার ছেলে মতো আর কাউকে যাতে এভাবে মরতে না হয়, সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

ওসি আবদুল হালিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘অপহরণের বিষয় নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। পুলিশ যখন বিষয়টি জানতে পেরেছে, তখন থেকে অপহরণকারীদের ধরতে তৎপর হয়ে ওঠে। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে।’

ওসি আরও বলেন, ‘অপহরণের ঘটনায় গত ১২ মে জড়িত থাকার অভিযোগে রোহিঙ্গা শফি আলম ও তার ভাগ্নে আরাফাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি মতে, টেকনাফ দমদমিয়া পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।’

এদিকে, র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন জানিয়েছেন, অপহরণের পর তিন বন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও দুই জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। বুধবার টেকনাফের হাবিবছড়া গহিন পাহাড় থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলো– সৈয়দ হোসন ওরফে সোনালি ডাকাত (৩৫) ও এমরুল (৩০)।

তিনি বলেন, ‘টেকনাফ যাওয়ার পথে গাড়ি থামিয়ে তিন বন্ধুকে অপহরণ করা হয়। পরে তাদের পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দাবিকৃত মুক্তিপণ দিতে না পারায় তাদের হত্যা করে অপহরণকারীরা।’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমনের ভাষ্যমতে, গত ২৮ এপ্রিল টেকনাফ সদরে কোহিনূর নামে এক মেয়েকে দেখার টোপ দিয়ে রুবেলসহ তার দুই বন্ধুকে ডেকে আনে রোহিঙ্গা শফি আলম। তিন বন্ধুকে অপহরণের বিষয়টি নজরে আসার পর কাজ শুরু করে পুলিশ। শফির দেওয়া তথ্যমতে তার ভাগ্নে আরাফাতকে টেকনাফের মুচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে অপহৃত রুবেলের ব্যবহৃত মোবাইল উদ্ধার করা হয়। পরে র‌্যাব তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় আরও দুই জনকে গ্রেফতার করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী টেকনাফ দমদমিয়া এলাকার গহিন পাহাড় থেকে তিন বন্ধুর মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। মরদেহগুলো ছিল অর্ধগলিত। গ্রেফতার দুই জন প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে, তারা এই কাজে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। বিত্তশালীদের টার্গেট করে অপহরণ করতো তারা। দিনের বেলায় এই চক্রের সদস্যরা লোকালয়ে এসে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশ ধরে থাকতো। রাতের বেলায় পাহাড়ে গিয়ে অপহৃতদের নির্যাতন করতো। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয় তাদের মাটির মধ্যে পুঁতে রাখে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ এপ্রিল টেকনাফে বেড়াতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন কক্সবাজারের চৌফলদন্ডী উত্তরপাড়ার রুবেল, ঈদগাঁও উপজেলার জালালাবাদ সওদাগর পাড়ার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া এলাকার ইমরান। তারা তিন জন বন্ধু। পরে ২৪ মে টেকনাফের দমদমিয়া পাহাড়ি এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।