এখনও কাস্টমসে পড়ে আছে ২৪ সাবেক এমপির বিলাসবহুল গাড়ি

শুল্কমুক্ত সুবিধায় সাবেক সংসদ সদস্যদের (এমপি) আমদানি করা বিলাসবহুল গাড়িগুলো ছাড় নিতে চিঠি দিয়েও সাড়া পায়নি চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এসব গাড়ির আমদানিকারক ২৪ জন সাবেক সংসদ সদস্যদের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েছিল চট্টগ্রাম কাস্টমস। গত তিন সপ্তাহে একটি চিঠিরও জবাব আসেনি। এখন দ্বিতীয় দফায় চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। দ্বিতীয় দফায় চিঠি পাঠানোর ১৫ দিনের মধ্যে এসব গাড়ি শুল্ক পরিশোধ করে ছাড় না নিলে তোলা হবে নিলামে। এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক যেসব গাড়ি বন্দর থেকে খালাস নেননি, সেগুলোর মধ্যে ২৪টির তালিকা বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসে পাঠিয়েছে। নিলামের অংশ হিসেবে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এসব গাড়ির আমদানিকারকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত ২২ ও ২৩ অক্টোবর এসব গাড়ির আমদানিকারক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। প্রতিটি চিঠিতে পনেরো দিনের সময় দিয়ে গাড়ির নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে ছাড় নিতে বলা হয়েছে। অথচ তিন সপ্তাহ হলেও একটি চিঠিরও জবাব আসেনি। এমনকি ২৪ জন আমদানিকারকের মধ্যে কারও সাড়াও মেলেনি। এখন নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় চিঠি ইস্যু করা হবে। ওই চিঠির জবাবও ১৫ দিনের মধ্যে না এলে আমরা নিলাম প্রক্রিয়ায় চলে যাবো। বর্তমানে চিঠি ইস্যু করার বিষয়টিও নিলাম প্রক্রিয়ার অংশ।’

দ্বিতীয় দফার চিঠিতে সাড়া না মিললে নিলামে উঠবে ২৪টি বিলাসবহুল গাড়ি। ওই ২৪ গাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫টি ল্যান্ড ক্রুজার মডেলের গাড়ি রয়েছে।

প্রথম ধাপে চিঠি পাঠানো ২৪ সাবেক সংসদ সদস্যের মধ্যে রয়েছেন– তারানা হালিম, ময়মনসিংহের আব্দুল ওয়াহেদ, জামালপুরের আবুল কালাম আজাদ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এসএম আল মামুন, বাঁশখালীর মুজিবুর রহমান, খুলনার এসএম কামাল হোসেন, নওগাঁর সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, গাইবান্ধার শাহ সরোয়ার কবির, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসএকে একরামুজ্জামান, নেত্রকোনার সাজ্জাদুল হাসান, ঝিনাইদহের নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, যশোরের তৌহিদুজ্জামান ও সুনামগঞ্জের মুহাম্মদ সাদিক। তবে সরকার পতনের আগে জুলাই মাসে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও ব্যারিস্টার সুমনসহ সাত জন এমপি তাদের গাড়ি ছাড়িয়ে নেন।

সাবেক সংসদ সদস্যদের আমদানি করা অর্ধশত গাড়ির মধ্যে রয়েছে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, টয়োটা জিপ, টয়োটা এলসি স্টেশন ওয়াগন, প্রাডো, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ ও রেঞ্জ রোভারসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড। এসব গাড়ি পড়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেড এবং মাল্টিপল শেডে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এসব গাড়ি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। যে কারণে আমদানিকারকরা পাচ্ছেন না শুল্কমুক্ত সুবিধা।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরাই শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব গাড়ি আমদানি করেছিলেন। কিন্তু ছাড় করানোর আগেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংসদ ভেঙে যাওয়ায় এমপিরা এ শুল্কমুক্ত সুবিধার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হন। চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর এসব গাড়ির কিছু রাখা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেডে। আর কিছু রয়েছে বন্দরের ভেতর মাল্টিপল শেডে। নিয়ম অনুযায়ী আমদানিকারকদের এসব গাড়ি ৩০ দিনের মধ্যে ছাড় নেওয়া বাধ্যবাধকতা থাকলেও নেওয়া হয়নি। বর্তমানে এসব গাড়ি ছাড় নিতে হলে ৮৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে একেকটি গাড়ি ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত দাম পড়বে। সংসদ সদস্যদের এসব গাড়ি শুধু আমদানি মূল্যে এক কোটি ৩০ লাখ টাকায় পাওয়ার সুযোগ ছিল।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা প্রতি মেয়াদে একবার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানির সুযোগ পেয়ে থাকেন। এসব গাড়ি আমদানি থেকে ছাড় নেওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকারের দুটি চিঠির প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রথম চিঠিটা প্রয়োজন হয় এলসি খোলার সময়। দ্বিতীয় চিঠি প্রয়োজন হয় আমদানি করা গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় ছাড় নেওয়ার জন্য।’

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সাবেক সংসদ সদস্যদের যেসব গাড়ি আটকে আছে সেগুলোর জন্য তারা স্পিকারের প্রথম চিঠিটা এনেছিলেন। তবে এগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার আগে বা পরে সরকার পতন এবং সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এজন্য স্পিকারের দ্বিতীয় চিঠিটা তারা আনতে পারেননি। এ কারণে গাড়িগুলো বন্দরে আটকে গেছে। এজন্য তারা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা গাড়ি আর শুল্কমুক্তভাবে পাবেন না।’