বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠী ইউনিয়নের দাসেরহাট মসজিদ বাড়ি পয়েন্টে ডুবে যাওয়া লঞ্চটিকে বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর বেলা ১১টার দিকে উদ্ধার তৎপরতা আপাতত সমাপ্তি ঘোষণা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন। লঞ্চডুবির ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান তিনি। তিনি জানান, লঞ্চের মালিক ইউসুফ ডাক্তারকে খোঁজা হচ্ছে। তার বাড়ি বানারীপাড়ার হাবিবপুরে। তার মালিকানাধীন ‘এমএল ইকরা’ মেরামতের জন্যে ডকে থাকায় তার পরিবর্তে রুট-পারমিটবিহীন ‘এমএল ঐশী’ চালানো হচ্ছিল।
বিআইডব্লিউটিএ-র পক্ষ থেকে বরিশালের নৌবন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘নিমজ্জিত এমএল ঐশী আসলে কোনও লঞ্চ নয়, এটি একটি ট্রলার। এর কোনও রুট পারমিট ও ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। ঈদের সময়টাতে যাত্রী পরিবহনের জন্য এটি নামানো হয়েছিলো।’
স্থানীয়রা তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন, এমএল ঐশী দীর্ঘদিন থেকে এই রুটে যাত্রী বহন করছে। শুধু ঐশী নয়, আরও অন্তত ৮টি লঞ্চ বানারীপাড়া ঘাট থেকে এভাবে যাত্রী বহন করে। এসব ঘটনা বন্দর কর্মকর্তা ভালো করেই জানেন। দায় এড়ানোর জন্য এখন উল্টো কথা বলছেন।
অপরদিকে উদ্ধার তৎপরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বজনহারা মানুষেরা। অভিযোগ করেছেন উদ্ধার অভিযানে গাফিলতি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাতভর তারা ডুবে যাওয়া স্বজনদের লাশ ফিরে পেতে নদীর তীরে অপেক্ষা করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মো. আসাদ জানান, ‘বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বানারীপাড়া থেকে অন্তত ৫০ জন যাত্রী নিয়ে ‘এমএল ঐশী’ লঞ্চটি হাবিবপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। পথে শুরু হয় বৃষ্টি। একপর্যায়ে লঞ্চটি বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ দাসেরহাটের মসজিদ বাড়ি স্টেশনে ঘাট দিলে সামনে থাকা অন্তত ৬ জন যাত্রী নেমে পড়েন। বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ যাত্রী লঞ্চটির নিচের তলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের কয়েকজন এই ঘাটে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ঘাট এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন হয়। ভাঙনের সময় আতঙ্কিত যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করলে সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটির সামনের দিক নদীর মধ্যে ডুবে যেতে থাকে। ’
তিনি জানান, ‘আচমকা এমন ধাক্কা খেয়ে সব যাত্রীরা লঞ্চের সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লে এর পেছনের দিকটা জেগে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া লঞ্চের কোনও যাত্রী বেঁচেছেন এমন খবর মেলেনি। বেলা দেড়টা নাগাদ দু’জন নারীর লাশ ভেসে ওঠে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বেলা পৌনে ১টা নাগাদ ডুবুরি দল নিমজ্জিত লঞ্চের সন্ধানে নামে। দুর্ঘটনার ৪ ঘন্টা পর স্থানীয় জেলে সাইদুল ও সুমনের নোঙ্গরে এই লঞ্চটি প্রথম চিহ্নিত হয়।পরে তারা নোঙ্গর হস্তান্তর করেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের কাছে।’
নির্ধারিত স্থানে ডুবুরিরা পৌঁছে বেলা ৪টার আগে আরও ১১টি লাশ উদ্ধার করেন। পরে লাশগুলো স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধারে দু’টি বলগেটের সহায়তায় কাজ শুরু হলে সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ লঞ্চে বাঁধা একটি দড়ি ছিড়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় উদ্ধার কাজ সাময়িক স্থগিত করা হয়। বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ’নির্ভীক’ লঞ্চটিকে পানির ওপরে টেনে তোলে ।
উদ্ধারের সময় ও পরে লঞ্চের ভেতর থেকে ৪ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বানারিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যান রহিমা বেগম (৪০)। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন শিকদার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও জানান, ‘ফায়ার সার্ভিসের স্বরূপকাঠী স্টেশনের ফায়ারম্যান রুহুল আমীন ছুটি কাটাতে ঐশী লঞ্চে চড়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। লঞ্চটি উদ্ধারের পর তাতে তার মোবাইল ফোনটি পাওয়া গেছে।’
সিলেট জজ কোর্টের অফিস সহকারী ও উজিরপুর উপজেলার কেশবকাঠি গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক মোল্লা ও রেক্সোনা দম্পতি নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে সন্ধ্যা নদীর তীরে বসে আছেন। তাদের চোখের জল শুকিয়ে গেছে। বিলাপ করার শব্দ গলা থেকে বের হচ্ছে না। জ্ঞান ফিরছে তো আবার মুর্ছা যাচ্ছেন। জমজ সন্তান সৈকত ও শান্তাকে নিয়ে স্বরূপকাঠির ভাসমান হাসপাতালে গিয়েছিলেন ওই দম্পতি। সেখান থেকে এমএল ঐশী নৌযানে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। নৌযানটি ডুবে যাওয়া স্থানের পরের ঘাটে তাদের নামার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই লঞ্চটি ডুবে যায়।
সিদ্দিক মোল্লা জানান, ‘লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর স্রোতে কয়েকবার উল্টে যায়। দুই সন্তান সৈকত ও শান্তাকে শক্ত করে ধরে রাখলেও উল্টে যাওয়ার সময় হাত থেকে ছুটে গেছে।’ স্বামী স্ত্রী কোনোভাবে জানালা দিয়ে বের হয়ে বাঁচতে পেরেছেন। তবে দুই সন্তানকে হারিয়ে তারা এখন পাগল প্রায়। শান্তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু সৈকত এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
লঞ্চের যাত্রী প্রবাসী মিলন ঘরামী ও স্ত্রী খুকুমনির একমাত্র সন্তান সাফওয়ানকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু তিনজনের কারোরই আর বাড়ি ফেরা হয়নি। মিলন ঘরামী এবং শিশু সাফওয়ানের মরদেহ পাওয়া গেলেও খুকুমনির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
তাদের মতো আরও ১৪ নিখোঁজ যাত্রীর স্বজনরা আহাজারি করছেন সন্ধ্যা নদীর তীরে। তারা খুঁজে ফিরছেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের।
যাদের লাশ উদ্ধার হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন- কোহিনুর বেগম (৬০), সাগর মীর (২৫), ফিরোজা বেগম (৫০), শুকদেব মল্লিক (৪০), মুজাম্মেল মোল্লা (৬০), রেহানা বেগম (৩০), রাবেয়া খাতুন (৪৫) জয়নাল হাওলাদার (৬০) ইরা বেগম (২৩), ফিরোজা বেগম (৫০), জয়নাল হাওলাদার (৬০), মিলন ঘরামি (৩৫), আবদুর রশীদ (৪৪),রিয়াদ হাওলাদার (৫), মাইশা (৪), মারিয়া বেগম (৩) ও সাফওয়ান (৩)।
আরও ১৪ জনের নাম রয়েছে নিখোঁজের তালিকায়। পুলিশের পক্ষ থেকে নিখোঁজ তালিকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে দাফন বাবদ ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
ঘটনার পরেই দুর্ঘটনা স্থলে পৌঁছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি, অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস এমপি, জেলা প্রশাসক ড. গাজী সাইফুজ্জামান, পুলিশ সুপার এস এম আখতার হোসেনসহ বানারীপাড়া ও উজিরপুর উপজেলার সব সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা।
/এফএস/আপ-এনএস/