খাটো জাতের নারিকেল গাছের সবচেয়ে বড় বাগান ঝালকাঠিতে

ভিয়েতনামের খাটো জাতের নারিকেল গাছ (ছবি: প্রতিনিধি)দেশে খাটো জাতের নারিকেল গাছের সবচেয়ে বড় বাগান তৈরি করেছেন ঝালকাঠির মাহাফুজুর রহমান। প্রায় তিন একর জমিতে ভিয়েতনামের খাটো জাতের এই নারিকেল গাছের চাষ শুরু করেছেন তিনি। খুব কম জায়গায়, অল্প পরিচর্যায় দ্রুত ফলন দেয় এই গাছ। যে কোনও ধরনের মাটিতেও এই নারিকেল গাছ লাগানো যায়। এশা ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচার নামের এই বাগানে একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফলেরও চাষ করছেন মাহাফুজ।

পৈত্রিক বসতভিটা ছাড়া তেমন কোনও জমিজমা ছিল না মাহাফুজুর রহমানের। এরপরও তিনি কৃষিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ঝালকাঠি সদর উপজেলার বেশাইন খান গ্রামে কয়েকজনের কাছ থেকে আট হেক্টর জমি লিজ নিয়ে মাহাফুজ নারিকেল গাছের বাগান তৈরির উদ্যোগ নেন। উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ের কবল থেকে গাছ ও ফল রক্ষায় ভিয়েতনামের খাটো জাতের এ নারিকেল গাছ বেছে নেন তিনি। দেশি জাতের নারিকেল গাছে ফল আসতে ৭-৮ বছর লাগলেও রোপনের তিন বছরের মধ্যেই ফল চলে আসে খাটো জাতের এই গাছে। সব ধরনের মাটিতেও এ গাছ লাগানো সম্ভব। ওপেন পলিনেটেড জাতের কারণে বীজ থেকেই চারা উৎপাদন করা হয়। এসব কারণে গ্রামের অন্য কৃষকরাও এখন এই নারিকেল চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

মাহাফুজের এই বাগানে পেয়ারা, আমড়া, আম, লেবু, পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ও শীতকালীন সবজিও চাষ করা হচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশে ভিয়েতনামের খাটো জাতের নারিকেল গাছের বাগানটি এরইমধ্যে পরিদর্শন করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফরিদা জাহান ও কৃষি অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ভিয়েতনামের আদলে নারিকেলভিত্তিক পরিবার বা সমাজ তৈরি করতে চায় সরকার। তাই বাংলাদেশে নতুন জাতের ডোয়ার্ফ বা বামন আকৃতির অধিক উৎপাদনশীল এই ‘ম্যাজিক নারিকেল গাছ’ আমদানি করা হয়েছে। খাটো জাতের এ নারিকেল গাছ রোপণের দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়। যেখানে দেশীয় লম্বা জাতের নারিকেল গাছে ফুল আসতে সময় লাগে ৭-৮ বছর। এছাড়া ডাবে পানির পরিমাণও অনেক বেশি। খাটো জাতের নারিকেল গাছে তিন বছরের মধ্যেই ফল আসে। সব ধরনের মাটিতে এ গাছ লাগানো সম্ভব। এছাড়া এ জাতের গাছ লবণাক্ততা অনেক বেশি সহ্য করতে পারে। গাছ খাটো হওয়ায় পরিচর্যাও সহজ।

কৃষি বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে দুই ধরনের ছোট জাতের নারিকেল গাছ আমদানি করা হয়েছে। মোট ৪০ কোটি খাটো জাতের নারিকেল গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আছে সরকারের।ভিয়েতনামের খাটো জাতের নারিকেল গাছ (ছবি: সংগৃহীত)

এশা ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচার এর পরিচালক মাহফুজুর রহমান জানান, ‘আমার এই বাগানে চাষ হওয়া কৃষি পণ্য ও ফল জেলার চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করা যাবে। এ খাটো জাতের নারিকেল গাছের চারা চাষ করে বছরে ২৫/৩০ লাখ টাকা উপার্জন করা সম্ভব।’
খামারের শ্রমিক আনসার আলী জানান, ‘এই নারিকেল খামারে আমার সঙ্গে নিয়মিত আরও পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন। এ খামার থেকে এখনই সপ্তাহে প্রায় দশ হাজার টাকা আয় হচ্ছে মাহাফুজের। তিন বছর পরে তার এ খামারের নারিকেল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানেও পাঠানো যাবে বলে আমরা আশা করছি।’

ঝালকাঠির সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বাগানের জন্য সহযোগিতা করে আসছি। মাহাফুজুর রহমানকে গাছের চারা সরবরাহসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শুক্কুর মোল্লা বলেন, ‘শুধু ঝালকাঠি নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলেই একজন ক্ষুদ্র চাষি হিসেবে মাহাফুজ সফল। তার ফসল সঠিকভাবে বাজারজাতের ব্যবস্থা করা গেলে এই এলাকারও উন্নয়ন ঘটবে।’

মাহাফুজের এই মিশ্র খামারটি এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই অনেক বেকার যুবক খামারটি দেখতে বেশাইন খান গ্রামে ছুটে আসছেন। তারা খামারের মালিক মাহাফুজুর রহমানের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এ ধরনের মিশ্র খামার করার পরিকল্পনা করছেন।