মিন্নি মুক্ত হওয়ায় খুশি পরিবার, ক্ষুব্ধ রিফাতের বাবা

জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বরগুনা জেলা কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি জামিনে মুক্ত হওয়ায় খুশি হয়েছেন তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। মিন্নি বাড়ি এসে পৌঁছালে তারা এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেন। তবে মিন্নি মুক্ত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রিফাত শরীফের বাবা ও মামলার বাদী আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। তারপক্ষের আইনজীবীরাও দাবি করছেন, মিন্নি মুক্ত হওয়ায় সাক্ষীরা প্রভাবিত হতে পারেন।

মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বরগুনা জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হন মিন্নি। এরপর তাকে তার বাবার বাড়ি বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেন, ‘আমার মেয়ে নিরাপরাধ। তাকে জোর করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার মেয়ে নির্দোষ; তাই তাকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন পর আমাদের কাছে পেয়েছি। এটা আমাদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো। মেয়েকে জামিনে মুক্ত করতে পেরে আমরা খুশি।’

তিনি বলেন, ‘শুধু খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, আমার ছেলের মতো জামাইটা আজ আর নেই। আর ওর খুনিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমার মেয়েকে ফাঁসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আমার বেয়াই।’

মিন্নি চিকিৎসার ব্যাপারে কী করা হবে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। আমরা কয়েক দিনের মধ্যে তাকে বরিশাল অথবা ঢাকা নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাবো।’

মিন্নির মা মিলি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। আমি আর কিছুই চাই না। আমার মেয়ের কতো দিন দেহি নাই। এইবার দুই চোখ ভইরা দেখমু। আমার মেয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকানো যায় না।’

মিন্নির চাচা আবু সালেহ বলেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা মিন্নিকে ফাঁসিয়ে খুনিদের আড়াল করার যে পরিকল্পনা করেছিল, মিন্নির জামিনে মুক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে কিছুটা হলেও তা লাঘব হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে রিফাতের সব হত্যাকারীকে আইনের আওতায় আনা হোক।’

এদিকে, মিন্নির মুক্ত হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট মিন্নিকে নারী বিবেচনায় জামিন দিয়েছেন। জামিন মানেই তার মুক্তি নয়। এই মামলার সুষ্ঠু তদন্তে মিন্নি নিশ্চয়ই দোষী হবে। শুধু মিন্নিই নয়, আমার ছেলেকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, আমি সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘মিন্নি যে কত নাটকবাজ তা কেউ বুঝতে পারবে না। আমার ছেলের সঙ্গে বিয়ের আগে নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল; সে বিষয়টি আমাদের কাছে গোপন করছে। আমার ছেলের সঙ্গে বিয়ের পর নিয়মিত নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। নয়ন বন্ডের সঙ্গে পরিকল্পনা করেই আমার ছেলেকে খুন করা হয়েছে।’

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘আমরা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে মিন্নিকে জামিনে মুক্ত করেছি। চার্জশিট হাতে পেলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই মিন্নিকে এই মামলা থেকেও মুক্ত করবো।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সঞ্জিব দাস বলেন, ‘মিন্নিকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার ফলে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার সাক্ষীরা প্রভাবিত হতে পারেন। আর আসামিরা প্রভাবিত হলে এই মামলায় ন্যায় বিচার পাওয়া থেকে বাদী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

গত বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নির জামিন আদেশ দেন। আদালতে মিন্নির জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মশিউর রহমান ও মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পী।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তার স্ত্রী মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের দমাতে পারেননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও পাঁচ-ছয় জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পরে ১৬ জুলাই সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে তার বাবার বাড়ি বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকা থেকে পুলিশলাইনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একই দিন রাত ৯টায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

পরদিন (১৭ জুলাই) মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর কয়েক দফা আবেদন জানালেও নিম্ন আদালতে জামিন মেলেনি মিন্নির। পরে জামিন চেয়ে মিন্নি হাইকোর্টে আবেদন করেন।

আরও পড়ুন-

মুক্তি পেলেন মিন্নি