ঝালকাঠির বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম গণহত্যা চালায়। এর মধ্যে সদর উপজেলার কৃর্ত্তীপাশা ইউনিয়নের বিলাঞ্চলে হানাদারদের হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন অসংখ্য মানুষ। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষকে এখানে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
জেলা শহরের বর্তমান পৌরসভা খেয়াঘাট এলাকাটি গণহত্যার আরেকটি সাক্ষী। সুগন্ধা নদীর পাড়ে এখানে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয় বলে শহীদ পরিবারগুলো জানিয়েছে। একাত্তরের ৩০ মে একদিনেই এখানে হত্যা করা হয় ১০৮ জনকে।
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঝালকাঠি সফরে আসেন। নৌপথে এই বধ্যভূমিটি পরিদর্শনকালে তিনি দেখতে পান শহীদদের মাথা-হাড়গোড়। নির্মম গণহত্যার সাক্ষ্যদানকারী ওই দৃশ্য দেখে বঙ্গবন্ধু কেঁদে ফেলেছিলেন বলে জানান এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পরবর্তী সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শহীদের হাড়গোড় তুলে সমাধিস্থ করা হয় ঝালকাঠি শহরের সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ বর্তমান শেখ রাসেল স্টেডিয়ামের পাশের পৌর সিটি পার্ক এলাকায়। পরে ওই কবরের ওপর নির্মাণ করা হয় জেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। অথচ সেই পৌর খেয়াঘাটের বধ্যভূমির চারপাশের এলাকা এখন ভরে গেছে দখলদারদের অবৈধ স্থাপনায়।
বাশবুনিয়া দাশেরবাড়ি বধ্যভূমিতে ৩৯ জনকে ধরে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। জেলা পরিষদ থেকে সামান্য কিছু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে জায়গাটি চিহ্নিত করা হয়েছে কেবল। ষাটপাকিয়া ফেরিঘাটের বধ্যভূমিতে তৈরি হয়েছে স্মৃতিফলক। জেলার রাজাপুরের একটি গণকবরও পাক হানাদারদের নির্মমতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
২০১২ সালে স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে নিয়ে বধ্যভূমি সংরক্ষণে কাজ শুরু করেন সংবাদকর্মী পলাশ রায়। ঝালকাঠি পৌর খেয়াঘাটে বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। নামকরণ হয় ‘বধ্যভূমি সংরক্ষণ হৃদয়ে একাত্তর’। বধ্যভূমি সংরক্ষণের দাবিতে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল সংগঠনটি। জেলা পরিষদের অর্থায়নে এটির সংরক্ষণ কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে।
বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির সাংগঠনিক উপদেষ্টা সাংবাদিক লেখক পলাশ রায় বলেন, ‘আমাদের আন্দোলনের ফলে ৮ বছর পরে পৌর খেয়াঘাটে বধ্যভূমি সংরক্ষণের কাজ শেষের পথে। এজন্য সরকার ও জেলা প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। জেলার সব বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার দাবি করছি।’
ঝালকাঠি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা দুলাল সাহা বলেন, ‘জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও গণপূর্ত বিভাগে ২২টি বধ্যভূমি, ১০টি সম্মুখ যুদ্ধের স্থান ও দুইটি গণকবরের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকেও একটি তালিকা নেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি, যত দ্রুত সম্ভব স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।’
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘ঝালকাঠি পৌর খেয়াঘাট বধ্যভূমির স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ভূমি অফিসকে খাস জমির জন্য খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য বধ্যভূমিগুলোতেও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’