দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাসেবাতেও। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের রোগীদের প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ রোগীদের স্বস্তির জন্য ভরসা এখন চার্জার ফ্যান ও হাতপাখা। একই ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীদের স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সরাও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন বিভাগের একটি অংশ ক্যাম্পাসের এক পাশে নির্মিত পাঁচতলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন। রোগীদের সঙ্গে থাকেন পাঁচ শতাধিক স্বজন। বিদ্যুৎ না থাকলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের গরমে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি
ভর্তিকৃত রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ফজরের নামাজের পর থেকে পরদিন একই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হওয়ায় দিনে মোট তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয় তাদের। এ সময় ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওয়ার্ডের ভেতরে গরম অসহনীয় হয়ে ওঠে।
মেডিসিন বিভাগে মেয়েকে নিয়ে সাত দিন ধরে হাসপাতালে থাকা আব্দুল কাইয়ুম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার মেয়ে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। আরও কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। কিন্তু প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে রোগী ও স্বজনদের মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতিরিক্ত রোগী ও স্বজন থাকায় এমনিতেই ভেতরে গরম থাকে। আলো-বাতাসও তেমন প্রবেশ করে না। ফ্যান চললেও গরম থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। এর মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং হলে সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। এজন্য একটি চার্জার ফ্যান কিনেছি। সঙ্গে দুটি হাতপাখাও এনেছি। মেয়েকে সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ হাতপাখা ও চার্জার ফ্যান দিয়ে বাতাস করতে হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ চলে গেলেই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে
শুধু কাইয়ুমের মেয়ে নন, মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে সিলিং ফ্যানের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগত চার্জার ফ্যান ব্যবহার করে কিছুটা স্বস্তি পান। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলেই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।
রোগীদের স্বজনরা জানান, তারা একাধিকবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জেনারেটর চালু করে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছেন। তাদের ভাষ্য, চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীও অতিরিক্ত গরম ও বিদ্যুৎহীনতায় আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ফলে রোগীর স্বাভাবিক চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনদের হাতপাখা ও চার্জার ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
পাঁচতলায় ভর্তি স্বামীর সঙ্গে থাকা রহিমা বেগম জানান, কোনও ওষুধ বা খাবারের প্রয়োজন হলে তাকে বারবার নিচে নামতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট বন্ধ থাকায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোগীকে ভালো করতে এসে আমরাই এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমার স্বামী একটু সুস্থ হলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি চলে যাবো। আমি দিনমজুরি করি। বড় ডাক্তার দেখানো বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি স্বামীকে একটু সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। তার কষ্ট কমাতে আমিও দুটি হাতপাখা কিনেছি।’
আইসিইউতে বাড়তি উদ্বেগ
সাধারণ ওয়ার্ডের তুলনায় লোডশেডিংয়ে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়েন আইসিইউতে থাকা রোগীরা। সেখানে দায়িত্ব পালন করা এক নার্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীদের নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কোনও ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তখন আমাদেরই জবাবদিহি করতে হবে। ফলে লোডশেডিং শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউর রোগীদের দেখভালে আমাদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।’
একাধিক নার্স জানান, রোগীর স্বজনরাও এ সময় সহযোগিতা করেন। অনেকে রোগীর জন্য চার্জার ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দেন।
তেল নেই, চালু হচ্ছে না জেনারেটর
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালের মূল ভবনে দুটি বিদ্যুৎ লাইন থাকায় সেখানে তেমন লোডশেডিং হয় না। তবে মেডিসিন বিভাগের ভবনে একটি লাইন থাকায় প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এজন্য গণপূর্ত বিভাগকে প্রতিদিন ১০০ লিটার করে তেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেখান থেকে উত্তর এসেছে, মন্ত্রণালয় থেকে তেল বাবদ কোনও বরাদ্দ দেওয়া হয় না। তবে রোগীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে মন্ত্রণালয় থেকে তেল বাবদ বরাদ্দ আনার চেষ্টা করছি আমরা। কিন্তু আজ পর্যন্ত গণপূর্ত বিভাগ তেল সরবরাহ করতে পারেনি।’
পরিচালক বলেন, ‘তেল না থাকায় মেডিসিন বিভাগে বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। এতে সেখানে ভর্তি প্রায় ৪০০ রোগী, তাদের স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমার পক্ষ থেকেও মন্ত্রণালয়কে লিখিত ও মৌখিকভাবে বারবার বলা হচ্ছে। তেল পাওয়া গেলে জেনারেটর প্রস্তুত রয়েছে, বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। এতে রোগীদের যে দুর্ভোগ হচ্ছে তা লাঘব করা সম্ভব হবে।’ তবে কবে নাগাদ তেল পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি হাসপাতালের পরিচালক।
তেলের বরাদ্দ নেই বলছে গণপূর্ত বিভাগ
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালের জেনারেটর চালানোর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে তেল বাবদ কোনও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় না। তারপরও তেলের জন্য টাকা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে জেনারেটর পরিচালনার জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করা হবে।’
তবে কবে নাগাদ বরাদ্দ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনও সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি। ফয়সাল আলম বলেন, ‘আমরাও চেষ্টা করছি তেলের বরাদ্দ আনার জন্য।’
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম
বরিশাল বিদ্যুৎ গ্রিড লাইনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বরিশালে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মরতরা জানান, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মূল ভবনে দুটি বিদ্যুৎ লাইন থাকায় সেখানে লোডশেডিং হয় না। তবে মেডিসিন বিভাগের ভবনে একটি লাইন থাকায় সেখানে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে কয়েক ঘণ্টা। এ ক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই।
ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, একটি মাত্র বিদ্যুৎ লাইন এবং জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি না থাকায় হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জায়গায় স্বস্তির বাতাস জোগাতে এখন ভরসা হয়ে উঠেছে হাতপাখা—এ অবস্থায় দেশের বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালভিত্তিক জরুরি সেবার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।