পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রতারণায় মামলায় প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতার না করে নাম ও বাবার নামে সাদৃশ্য থাকায় মো. জলিল হাওলাদার (৪৭) নামের অন্য একজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। পটুয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে পাঠানো একটি গ্রেফতারি পরোয়ানার বিপরীতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০ দিন পর সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) একই আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী মো. জলিল হাওলাদারের বাড়ি কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার বিপিনপুর শিববাড়িয়া গ্রামে। তিনি ওই এলাকার মালেক হাওলাদার ও হালিমা খাতুনের ছেলে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৪৭ বছর। তিনি পেশায় একজন জেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জলিলের আইনজীবী হুমায়ুন কবীর বাদশা।
তিনি বলেন, ‘মামলার প্রকৃত আসামি প্রবাসে থাকেন। কিন্তু নাম ও পরিচয়ে সাদৃশ্য থাকায় পুলিশ আমার মক্কেলকে গ্রেফতার করে। সোমবার আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে জলিলকে জামিন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনায় মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আগামী ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারাগারে জামিনের নথি পৌঁছানোর পর আজ বিকাল সোয়া ৫টার দিকে জলিল হাওলাদার মুক্তি পেয়েছেন।’
ভুক্তভোগী পরিবার ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট দুপুরে কলাপাড়া উপজেলার শিববাড়িয়া এলাকা থেকে মো. জলিল হাওলাদারকে গ্রেফতার করেন মহিপুর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শহিদুল ইসলাম। একই দিন তাকে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জলিল হাওলাদারের মেয়ে জেসমিন আক্তার জানান, তার বাবাকে গ্রেফতারের খবর শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় গ্রেফতারি পরোয়ানা ও মামলার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করেন। তার বাবার নামে এ ধরনের কোনও মামলা নেই বলেও পুলিশকে জানান। কিন্তু পুলিশ তার ও স্থানীয় লোকজনের আপত্তি উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে তার বাবাকে আদালতে পাঠায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলার প্রকৃত আসামি জলিল হাওলাদারের বাড়িও একই এলাকায়। তিনি ওই এলাকার আবদুল মালেক হাওলাদারের ছেলে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার মায়ের নাম মাজেদা বেগম এবং বয়স ৩৫ বছর। দুই ব্যক্তির পরিচয়ের ক্ষেত্রে শুধু মায়ের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর আলাদা।
প্রকৃত আসামি জলিল হাওলাদারের বাবা আবদুল মালেক হাওলাদার জানান, তার ছোট ছেলে জলিল হাওলাদার ২০২৩ সালের দিকে সৌদি আরবে যান। এরপর আর দেশে ফেরেননি। তার ছেলের পরিবর্তে পুলিশ অন্য একজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি মহিপুর থানা পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন তিনি।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৩ মে পটুয়াখালী সদর উপজেলার সেহাকাঠি গ্রামের রফিক মুন্সির ছেলে আলমগীর হোসেন অর্থ প্রতারণার অভিযোগে আদালতে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি কলাপাড়ার শিববাড়িয়া এলাকার আবদুল মালেক হাওলাদারের ছেলে জলিল হাওলাদারকে একমাত্র আসামি করেন। মামলার আরজিতে তিনি আসামির কাছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৩ টাকা পাওনা থাকার কথা উল্লেখ করেন।
পটুয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি আসামি জলিল হাওলাদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর একই বছরের ৮ মে তার সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার বাদী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মামলা করার বছরই আসামির বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর জানতে পারি আসামি দেশের বাইরে চলে গেছেন। কিছুদিন আগে মহিপুর থানার ওসি আমাকে ফোন করে আসামি গ্রেফতারের বিষয়টি জানান এবং আমার কাছ থেকে আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’
আসামির নাম, বাবার নাম এবং গ্রাম মিল থাকায় অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘গ্রেফতারি পরোয়ানার কপিতে আসামির মায়ের নাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর উল্লেখ থাকলে এ ধরনের ভুল হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর তার জামিন পাওয়ার বিষয়ে আইনজীবী নিয়োগসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে।’