সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির লাশের পাশে ৫ চিরকুট, যা লেখা আছে

বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো চিফ পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় লাশের পাশে পাঁচটি চিরকুট পাওয়া যায়। এতে উঠে এসেছে জীবন নিয়ে নানা আক্ষেপ। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডের দৈনিক সমকালের ব্যুরো অফিস থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুলক চ্যাটার্জি প্রায় তিন বছর আগে সমকাল থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে দীর্ঘদিন দৈনিক যুগান্তরে কাজ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। 

রাত ৯টার দিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ সমকাল কার্যালয়ে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাস্থল থেকে কয়েক পাতার সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। পুলক চ্যাটার্জির লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে পুলিশ সবকিছু যাচাই-বাছাই করছে। সিআইডির একটি দলও কাজ করছে। ময়নাতদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পুলিশ বলছে, পুলক চ্যাটার্জির লাশের পাশ থেকে পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটিতে লেখা হয়েছে, ‘মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি বেশকিছু রোগে আক্রান্ত। এই যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছি না।  অসুস্থতার কারণে আমি সামাজিকভাবেও পিছিয়ে পড়েছি। রোগের যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে আমি আত্মহত্যা করলাম। এজন্য কাউকে যাতে হয়রানি না করা হয়।’

সমকাল পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো অফিসের বর্তমানে দায়িত্বে থাকা সুমন চৌধুরীকে অনুরোধ করে আরেকটি চিরকুট লেখা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। সেটিতে বলা হয়—‘তোমার সঙ্গে একসাথে দেড় যুগ কাজ করেছি। কখনো কোন কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করিও। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। যদি পারো দৈনিক সমকাল পত্রিকায় আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বৌদির হাতে দিও।’

আরেক চিরকুটে স্ত্রী প্রিয়াংকাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে, ‘প্রিয়াঙ্কা আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতিকে (পুলক চ্যাটার্জির মেয়ে) দেখে রেখো এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেও। দীপক (পুলক চ্যাটার্জির ভাই) এর সাথে থেকো ও তোমাদের আগলে রাখবে।’

পুলক চ্যাটার্জির ভাই দীপক চ্যাটার্জিকে উল্লেখ করে আরেক চিরকুটে লেখা হয়েছে, ‘আমাকে ক্ষমা করিস। তোর ওপর অনেক বোঝা চাপিয়ে গেলাম। প্রিয়াঙ্কা (পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী) ও প্রকৃতিকে (পুলক চ্যাটার্জির মেয়ে) আগলে রাখিস।’ 

বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনকে উল্লেখ করে শেষ চিরকুটে লেখা হয়েছে, ‘আমি যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করেছি তাই ময়নাতদন্তের প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক ঝামেলা ছাড়া আমার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করিও। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। আমার স্ত্রী প্রিয়াংকা ও প্রকৃতির খেয়াল রাখিও। বিদায়।’

দৈনিক সমকালের বরিশাল অফিসের বর্তমান প্রধান স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরী বলেন, ‘পুলক চ্যাটার্জির কাছে অফিসের একটা চাবি থাকতো। প্রায়ই দিনে ও রাতে এসে অফিস খুলে সময় কাটাতেন। আজ দুপুরে একটি দাওয়াতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। বিকালে তার স্ত্রী ফোন করে জানান ফোন ধরছেন না পুলক। সন্ধ্যায় অফিসে এসে দেখি ভেতর থেকে অফিস তালাবদ্ধ। দরজা একটু ফাঁক করে দেখি গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলছেন। পরে দ্রুত পুলিশকে খবর দিই। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।’

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে আত্মহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।’