১৩৬ বছরে ‘বাংলার অক্সফোর্ড’, কীভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা?

১৩৬ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ খ্যাত বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। দীর্ঘ পথচলায় দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ২৭ হাজার ৩৪৫ জন শিক্ষার্থী। 

২২টি বিষয়ে অনার্স ও ২২টি বিষয়ে মাস্টার্সসহ উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়েও পাঠদান চলছে। তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাপের বিপরীতে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে সংকট। ফলে ঐতিহ্যের ভার বহন করলেও নানা সমস্যায় ধুঁকছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কলেজের প্রশাসনিক দফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ২২টি অনার্স ও ২২টি মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। এর বাইরে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশোনা করছেন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য অ্যাকাডেমিক ভবন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে পাঁচতলা তিনটি, চারতলা দুটি, তিনতলা দুটি এবং দুইতলা চারটি ভবন। এসব ভবনে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের পৃথক কক্ষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিনার কক্ষ রয়েছে। কলেজে ১৬টি ল্যাবরেটরি এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ৯৩ হাজার ৩৪৭টি বই রয়েছে। প্রতিটি বিভাগেও রয়েছে নিজস্ব লাইব্রেরি।

দীর্ঘ পথচলায় দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ২৭ হাজার ৩৪৫ জন শিক্ষার্থী

যেভাবে যাত্রা শুরু

১৮৫৩ সালে বরিশাল জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা কোনও প্রতিষ্ঠান ছিল না। স্থানীয় মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত ১৮৮৯ সালের ১৪ জুন তার বাবা ব্রজমোহন দত্তের নামে প্রতিষ্ঠা করেন বিএম কলেজ। শুরুতে কলেজের ক্লাস হতো বিএম স্কুলে। কয়েক বছর পর এটি বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। প্রায় ৬০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। বিজ্ঞান ভবনের গেটসংলগ্ন কালীপ্রসন্ন ভবনে শুরু হয় কলেজের প্রথম দিকের পাঠদান। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ভবনে বিস্তৃত হয় এর কার্যক্রম।

প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯২২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সময়কে বিএম কলেজের স্বর্ণযুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সে সময় কলেজটির শিক্ষার মান ও ফলাফল এতটাই ভালো ছিল যে এটি ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ নামে পরিচিতি পায়। সময়ের সঙ্গে এই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এখনও বিএম কলেজের নাম উঠলেই ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ কথাটি উচ্চারিত হয়।

দেশ ভাগে বিপর্যয়, আবার ঘুরে দাঁড়ানো

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বরিশাল ছেড়ে ভারতে চলে যান। এতে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। কলেজের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন অনার্স কোর্সেও। পরিস্থিতির কারণে ১৯৫০ সালে তৎকালীন কলেজ কর্তৃপক্ষকে বেশিরভাগ অনার্স কোর্স বন্ধ করে দিতে হয়।

২২টি বিষয়ে অনার্স ও ২২টি বিষয়ে মাস্টার্সসহ উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়েও পাঠদান চলছে

১৯৬৫ সালের ১ জুলাই কলেজটি প্রাদেশিকীকরণ করা হলে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়। বর্তমানে কলেজে ২৩টি বিষয়ে পাঠদান হচ্ছে। এর মধ্যে ২২টি বিষয়ে অনার্স এবং ২২টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিএম কলেজের ইতিহাসে রয়েছে একাধিক কৃতী শিক্ষার্থীর সাফল্য। ১৯২৮ সালে শ্রীমতী শান্তিসুধা ঘোষ (১৯০৭-১৯৯১) গণিতে অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে ‘ঈশান বৃত্তি’ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে রসায়নে অনার্স পরীক্ষায় দিলীপ কুমার চক্রবর্তী প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ‘কালীনারায়ণ বৃত্তি’ লাভ করেন। ২০০৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পরীক্ষায় মোসা. কামরুন নাহার প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারা দেশে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। ১৯৬৫ সাল থেকে বর্তমান সময়কে তাই বিএম কলেজের সমৃদ্ধির পর্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে ‘সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা’

মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত তার বাবা ব্রজমোহন দত্তের নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠার সময় ‘সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা’কে মূল আদর্শ হিসেবে ধারণ করেন। কলেজের প্রধান প্রবেশদ্বার ও বিভিন্ন স্মারকে এই নীতিবাক্য খোদাই করা রয়েছে।

এই আদর্শের স্মৃতি ধরে রাখতে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি ভবন পরবর্তীতে ভেঙে একই আদলে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। ভবনটির সামনে খোদাই করে লেখা হয়েছে ‘সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা’। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ‘সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা ভবন’ নামে পরিচিত। বর্তমানে সেখানে বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাস হয়। তৎকালীন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হানিফ ভবনটি নির্মাণ করেন। কলেজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি।

সাত হোস্টেলে ঠাঁই ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য বহুতল সাতটি হোস্টেল রয়েছে। এসব হোস্টেলে ছাত্রদের জন্য প্রায় ৯৩০টি এবং ছাত্রীদের জন্য প্রায় ৭০০টি আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৭ হাজারের বেশি।

বর্তমানে ২২টি অনার্স ও ২২টি মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে কলেজে

শিক্ষার্থীদের দাবি, অন্তত ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তার সামান্য অংশের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে। কয়েকটি হোস্টেলের জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বসবাস করতে হচ্ছে।

আবাসন সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময় আন্দোলন হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানান। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কলেজে এলে বিষয়টি জানানো হলেও সংকট কাটেনি। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের বাড়তি অর্থ জোগাড় করে বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

১৯০ পদের বিপরীতে কর্মরত ১৭২

শিক্ষার্থী বাড়লেও সেই অনুপাতে শিক্ষক বাড়েনি বলে অভিযোগ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, পুরোনো অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী শিক্ষক পদের সংখ্যা ১৯০টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৭২ জন। দীর্ঘদিন ধরে ৩৩টি পদ শূন্য রয়েছে বলেও তারা জানান। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় প্রয়োজন তিন শতাধিক শিক্ষক।

শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তাদের ভাষ্য, অনার্সে প্রতিদিন চারটি করে ক্লাস থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় দুই থেকে তিনটির বেশি ক্লাস হয় না। মাস্টার্সের ক্লাসও নিয়মিত হয় না বলে তারা দাবি করেন।

বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও পরিবহন সংকটও প্রকট। এসব সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের আশ্বাসের মধ্যেই অনেক উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে তাদের অভিযোগ।

২৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বাস মাত্র চারটি

কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বরিশাল নগরী ছাড়াও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য কলেজের নিজস্ব পরিবহন সুবিধা প্রয়োজন। তাদের মতে, এ জন্য অন্তত ১০টি বাস দরকার হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র চারটি। পরিবহন সংকট নিয়েও বিভিন্ন সময় আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাস বাড়ানো হয়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানান।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য অ্যাকাডেমিক ভবন রয়েছে ১১টি

সবুজে ঘেরা ঐতিহ্যের ক্যাম্পাস

শুধু শিক্ষা ও ইতিহাস নয়, সবুজ-শ্যামল পরিবেশও বিএম কলেজের অন্যতম আকর্ষণ। ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জাম, জারুল, রঙ্গন ও মেহগনিসহ নানা প্রজাতির গাছ। বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে বিরল প্রজাতির নাগলিঙ্গমসহ বিভিন্ন ফুলের গাছ। এসব গাছের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ও নতুন ভবন মিলিয়ে ক্যাম্পাসটি ধারণ করে আছে দীর্ঘ ইতিহাসের নানা স্মৃতি।

যা বলছেন অধ্যক্ষ

সরকারি বিএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ খ্যাত বিএম কলেজে নানা সংকট রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও যানবাহনের সংকট প্রকট। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষেরও সংকট রয়েছে। কলেজে ১০ তলাবিশিষ্ট দুই থেকে তিনটি হোস্টেল প্রয়োজন। পাশাপাশি বহুতল একাধিক অ্যাকাডেমিক ভবন দরকার। তবে সবার আগে শিক্ষক সংকট নিরসন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য একাধিক বাসও প্রয়োজন।’

অধ্যক্ষের ভাষ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যান্য কলেজের মতো বিএম কলেজকেও একইভাবে বিবেচনা করে। অথচ এটি বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট না পাওয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রম কচ্ছপগতিতে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কলেজের যেসব সংকট রয়েছে, সেগুলো লিখিত ও মৌখিকভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হচ্ছে। কিন্তু এখনও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কলেজে এলে তাদেরও এসব বিষয় অবহিত করা হচ্ছে। আমি নিজেও একাধিকবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বাজেটের জন্য অনুরোধ করেছি। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়ায় অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।’