উত্তরের জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার এক অনন্য বাতিঘর পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ। তৎকালীন রূপসী ইছামতির কোলঘেঁষে প্রায় ৫০ একর ভূমির ওপর বিস্তৃত মনোরম ও সবুজেঘেরা প্রাঙ্গণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ।
দীর্ঘ ১২৮ বছরের পথচলায় উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও আলোকিত সমাজ গঠনে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিদ্যাপীঠ আজ অগণিত মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী, শিক্ষাবিদ ও সফল দেশসেবক তৈরির সূতিকাগার।
পাবনা কলেজ থেকে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ
১৮৯৮ সালে পাবনা শহরের বুকে ‘পাবনা কলেজ’ নামে অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। শিক্ষানুরাগী শিক্ষাবিদ গোপালচন্দ্র লাহিড়ী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী সুধীজনের উদারতায় কলেজটির ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিস্বরূপ এর পুনঃনামকরণ করা হয় ‘এডওয়ার্ড কলেজ’।
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ গোপালচন্দ্র লাহিড়ীর পাশাপাশি পাবনার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রাজা রায় বনমালী রায় বাহাদুর, শিতিকণ্ঠ বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাধিকানাথ দত্তের মতো দানশীল ব্যক্তিদের দরাজ সহযোগিতা এই কলেজের গোড়াপত্তনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। প্রতিষ্ঠার পর একে একে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে অবশেষে ১৯৬৮ সালের ১ মার্চ কলেজটি সরকারি হয় এবং নাম হয় ‘সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ’।
আন্দোলন-সংগ্রামের সাক্ষী
অবিভক্ত ভারত, পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে এই কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাকামী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিদ্যাপীঠের ভূমিকা ছিল সাহসী ও ঐতিহাসিক। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে কলেজের অনেক বীর ছাত্র ও শিক্ষক মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দিয়ে অমর হয়ে আছেন। কলেজের বিভিন্ন ভবন ও চত্বরে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতির ছাপ আজও বিদ্যমান।
২৬ হাজার শিক্ষার্থী, ১৯ বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স
বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেরা কলেজগুলোর তালিকায় নিজ নাম ধরে রাখা এই বিদ্যাপীঠে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই তিনটি মূল অনুষদের অধীনে মোট ১৯টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পাঠদান কার্যক্রম চালু রয়েছে।
কলেজে শিক্ষকের মোট অনুমোদিত পদ ১৬৬টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৩৩ জন শিক্ষক। অর্থাৎ ৩৩টি শিক্ষক পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। তবে শিক্ষক সংকট থাকলেও শ্রেণিকক্ষের কোনও সংকট নেই বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্যগত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা কাঠামোর প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছে। প্রতিটি বিভাগে নিয়মিত তাত্ত্বিক ক্লাসের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পৃথক গবেষণাগার। বর্তমানে কলেজের সবগুলো ল্যাবই সচল রয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে সংগতি রেখে নিয়মিত ইনকোর্স পরীক্ষা, টিউটোরিয়াল মূল্যায়ন, সেমিনার, বক্তৃতা ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক অগ্রগতি ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
৫০ হাজারের বেশি বইয়ের পাঠাগার, এখনও অ্যানালগ
শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান সহায়ক কলেজের কেন্দ্রীয় পাঠাগার। এখানে বিভিন্ন দুর্লভ গ্রন্থ, সাময়িকী, নথিপত্র ও আধুনিক তথ্যকোষসহ ৫০ হাজার ৮৫১টি বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থী পাঠাগার ব্যবহার করেন। তবে এত বিপুল শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমের বিপরীতে পাঠাগারটি এখনও সম্পূর্ণ অ্যানালগ ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় পাঠাগার পরিচালিত হলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার আরও বাড়বে বলে মনে করেন প্রধান গ্রন্থাগারিক মো. সুলভ হোসেন।
আবাসিক হল আছে, আসন সংকটও
দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য কলেজে রয়েছে একাধিক আবাসিক হল। ছেলেদের জন্য রয়েছে লাহিড়ী হল, বিজয় ২৪ হল (সাবেক শেখ রাসেল হল), কামাল উদ্দীন হল ও শামসুজ্জোহা হল। এর মধ্যে হিন্দু ছাত্রদের জন্য রয়েছে লাহিড়ী হল। মেয়েদের জন্য রয়েছে জুলাই ৩৬ ছাত্রীনিবাস (সাবেক সুচিত্রা সেন হল) ও আয়েশা সিদ্দিকা হল। এ ছাড়া হিন্দু ছাত্রীদের জন্য রয়েছে গোপী সুন্দরী হল।
তবে আবাসিক হলের সংখ্যা থাকলেও আসন সংকট রয়েছে। অধিকাংশ হলেই ধারণক্ষমতার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। ফলে কলেজে আবাসিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চাহিদার তুলনায় আসন সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধার বাইরে থাকতে হয়।
সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সাফল্য
শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের সাফল্য সমাদৃত। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতো সেবামূলক সংগঠনে কলেজের শিক্ষার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া পাবনার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এডওয়ার্ড কলেজ থিয়েটার, এডওয়ার্ড কলেজ ডিবেটিং ক্লাব ও সাহিত্য পরিষদের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে নতুন নেতৃত্ব ও প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে চলেছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা বহুবার সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় সবুজ ক্যাম্পাস
কলেজের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও বেশ বিস্তৃত। দৃষ্টিনন্দন লাল ইটের প্রাচীন ভবন, মূল প্রশাসনিক ভবন, বিশাল খেলার তিনটি মাঠ, শান্ত-স্নিগ্ধ কয়েকটি বড় পুকুর এবং সারি সারি মেহগনি ও কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়াঘেরা পথ পুরো ক্যাম্পাসকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। প্রাচীন স্থাপনার সঙ্গে আধুনিক ভবন ও শিক্ষার অবকাঠামোর সমন্বয়ে ক্যাম্পাসটি একই সঙ্গে ঐতিহ্য ও বর্তমান সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে।
বিশাল ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ১৪ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের থাকার জন্য ক্যাম্পাসে রয়েছে আলাদা ভবন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি কলেজের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিরাপত্তায় তারা নিয়মিত কাজ করছেন।
শিক্ষার্থীদের চোখে ক্যাম্পাস
ইংরেজি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুপক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলেজের শিক্ষার পরিবেশ এখন আগের তুলনায় অনেক ভালো। নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে এবং পড়াশোনার পরিবেশও স্বাভাবিক রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে ক্লাস ও অন্যান্য অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন।’
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনিমা ফারিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যান্য অনেক কলেজের তুলনায় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে মেয়েদের চলাচল বেশ সুবিধাজনক। ক্যাম্পাসের পরিবেশও তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক। ফলে মেয়েরা নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে স্বাচ্ছন্দ্যে অংশ নিতে পারেন।’
শিক্ষক সংকট নিরসনের আশ্বাস
কলেজে শিক্ষকের অনুমোদিত ১৬৬টি পদের বিপরীতে ৩৩টি পদ শূন্য রয়েছে। এ সংকটের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল আউয়াল।
তিনি জানান, কলেজের ৩৩টি শূন্য শিক্ষক পদ পূরণের বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব পদ পূরণের মাধ্যমে শিক্ষক সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।
একই সঙ্গে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে একটি ১০ তলা ও একটি ৬ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যও আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছেন বলে জানান অধ্যক্ষ।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে কলেজের পাঠাগারের পরিবেশ ইতোমধ্যে উন্নত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পাঠাগারকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আগামীর প্রত্যাশা
১২৮ বছরের ইতিহাস, প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী, বিস্তৃত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি নিয়ে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ আজও উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
তবে সামনে আরও এগিয়ে যেতে হলে শিক্ষক সংকট দূর করার পাশাপাশি পাঠাগারকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা, আবাসিক হলের আসন সংখ্যা বাড়ানো এবং আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা জরুরি। কলেজের সব ল্যাব বর্তমানে সচল এবং শ্রেণিকক্ষের সংকট না থাকলেও শিক্ষক পদ শূন্য থাকা ও আবাসিক হলে ধারণক্ষমতার বেশি শিক্ষার্থী থাকা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।









