চট্টগ্রামে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বাড়ছেই!

পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস (ছবি: সংগৃহীত)
চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল যেন থামানোই যাচ্ছে না। উল্টো বছর বছর এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়ায় এলাকায় পাহাড় ধসে মারা গেছেন ১৭ জন।  জানা গেছে, গত ১০ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মারা গেছে দুই শতাধিক। বছর বছর এই সংখ্যা বাড়লেও তাদের বাঁচানোর যেন কেউ নেই। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের উদাসিনতায় উল্টো দিন দিন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বাড়ছে।  

২০০৭ সালে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে প্রশাসন। গত ১০ বছরে এই কমিটিকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে দু’য়েকটি সভা আয়োজনের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে জেলা প্রশাসনেরও নেই তেমন কোনও পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি বছর বৃষ্টির আগে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন। স্থায়ী পূনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় লোক দেখানো এসব অভিযানের পরপরই পাহাড়ে আবার ফিরে যায় বসবাসকারীরা।  আর বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে প্রশাসনের তোড়জোড় থাকলেও বর্ষার পরপরই বিষয়টি চোখের আড়ালে চলে যায়।

পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস (ছবি: সংগৃহীত)

পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক শরীফ চৌহান বলেন, ‘পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে জড়িতরা চিহ্নিত হলেও কখনোই প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। দখলকারীরা তাদের অবস্থানেই বহাল আছে। উল্টো প্রতিবছর নতুন পাহাড় কেটে আরও বসতি স্থাপন করছে। এভাবে চলতে থাকলে এক দশক পরে শহর ও আশেপাশের এলাকায় একটি পাহাড়ও আর অবশিষ্ট থাকবে না। তখন আর পাহাড় রক্ষার দাবিও জানাতে হবে না। সব পাহাড় শেষ হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

পরিবেশবাদী আন্দোলনকর্মী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করা ও তাদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের সুপারিশগুলোই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। দখল হওয়া পাহাড়গুলোর অধিকাংশের মালিক সরকারি সংস্থা। অথচ তাদেরই কোনও নড়চড় নেই।’পাহাড় ধস (ছবি: সংগৃহীত)

২০০৭ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসে মারা যান ১২৭ জন। ২০০৮ সালে পাহাড় ধসে মারা যান ১১ জন। ২০০৯ ও ২০১০ সালে মারা যান ১৫ জন। ২০১১ সালে ১৭ জন মারা যান।  ২০১২ সালে মারা যান ২৩ জন। ২০১৩ সালে মারা যান ৫ জন। ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই মারা যায় ৫ শিশুসহ ৬ জন। সর্বশেষ আজ মঙ্গলবার(১৩ জুন) পাহাড় ধসে মারা গেছেন আরও ১৭ জন।

অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি ও বস্তি তৈরি করে এসব কম টাকায় ভাড়া দেয় প্রভাবশালীরা। সেই অবৈধ ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ থাকায় নগরীর স্বল্প আয়ের মানুষেরা ওইসব ঘরে ভাড়া থাকছেন। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এ বসবাস রোধ করতে না পারার কারণে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল।

২০০৭ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ণ করে। সেই সুপারিশগুলো আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

গত ৫ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, নগরীতে ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালে ওই কমিটি জানিয়েছিল নগরীর ১১টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে।  এরপর চার বছরেও  এই তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। প্রশাসনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তালিকায় এখনও ৬৬৬টি পরিবারই রয়েছে। অথচ বাস্তবে দেখা গেছে, এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিবার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।চট্টগ্রামে পাহাড়ে ধসের বিষয়ে সতর্ক করে মাইকিং

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, খুলশী, লালখান বাজার, পাহাড়তলী, টাইগার পাস, আমবাগান, বাটালি হিল রেলওয়ে কলোনি, পাহাড়তলী রেল কলোনি, বায়েজিদ বোস্তামি, হাটহাজারী উপজেলার ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী সিটি করপোরেশন ওয়ার্ডের শাহ আমানত কলোনি, কাছিয়াঘোনা, লেবু বাগান, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর, লতিফপুর ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ। শুধু মতিঝর্ণা ও এ কে খান পাহাড়েই বসবাস করছে ৫ হাজারের অধিক পরিবার।

মতিঝরনার পাহাড়ি বস্তিতে বসবাসকারী রিকশচালক জামালউদ্দিন, দিনমজুর রুবেলসহ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারী একাধিক বাসিন্দা জানান, তারা ভূমিহীন। যাওয়ার মতো স্থায়ী কোনও ঠিকানা তাদের নেই। আর নগরীর সাধারণ বাসা ভাড়ার তুলনায় এখানে বাসা ভাড়া অনেক কম। তাই বাধ্য হয়ে ও  জেনেশুনেই তারা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন।  তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন বিভিন্ন সময় তাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি কখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা পাহাড়গুলোর মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। ওইসব পাহাড়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের। আর এসব এলাকায় ঘরবাড়ি ও বস্তি নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি ও অনাপত্তি বিষয়টি দেখার দায়িত্ব গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু এই তিনটি মন্ত্রণালয় কখনও পাহাড়গুলোর খোঁজ খবর রাখেনি। তাদের উদাসিনতার সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু মহল পাহাড়গুলো দখল করে সেখানে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে ভাড়া দিচ্ছে।চট্টগ্রামে পাহাড়ে ধসের বিষয়ে সতর্ক করে মাইকিং

পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা বলছেন প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের  লেজুড়বৃত্তি, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করাসহ সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাহাড় মালিকদের উদাসীনতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেওয়া ও পুনর্বাসনে সফলতা আসছে না।

এ ব্যাপারে জানতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল জলিলের মোবাইল ফোনে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মহানগর অঞ্চলের পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসের বিষয়টি পুরোপুরিই জেলা প্রশাসনের এখতিয়ারে পড়ে বলে উল্লেখ করেন।  

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুকুর রহমান সিকদার বলেন, ‘স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়টি আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় স্থায়ী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অবৈধভাবে পাহাড়ের পাদদেশে ঘর তৈরি করে ভাড়া দেয়।  ফলে অনেক সময় প্রশাসন চেষ্টা করলেও তাদেরকে উচ্ছেদ করতে পারে না।’ পাহাড় ধস রোধে সরকার, রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

/এফএস/ 

আরও পড়ুন- রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নিহত ৭২