ভেসে আসা গাছের শেকড়ে ভাগ্য বদল!

শিকড়গুলোকে শৈল্পিক রূপ দিচ্ছেন লাল পিয়ান সাং বমবান্দরবানের পাহাড়ে কেটে ফেলা গাছের শেকড় সাঙ্গু নদী দিয়ে ভেসে ভেসে প্রায়ই লোকালয়ের কাছে এসে ঠেকে। ভেসে আসা এসব শেকড় সংগ্রহ করে সেগুলোতে শৈল্পিক রূপ দেন দারুশিল্পী লাল পিয়ান সাং বম। পরিত্যক্ত শেকড় দিয়ে তিনি তৈরি করেন চেয়ার, টেবিল, শো-পিস, ফুলদানিসহ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করার মতো নানা জিনিসপত্র। সেসব জিনিস রাজধানীর বাণিজ্য মেলাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থাও বদলে ফেলেছেন তিনি। এখন তিনি স্থানীয় অনেকের কাছেই এক অনুপ্রেরণার নাম।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৭৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত দুর্গম রুমা উপজেলার মুনলাই পাড়ার বাসিন্দা লাল পিয়ান সাং বম। এক ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। বর্তমানে বড় মেয়ে রাঙামাটি রাজস্থলীর বাঙাল হালিয়ায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও ছোট ছেলে জন কেরি বম পাড়ার একটি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। দারুশিল্পের কাজ শুরু করার পর থেকে ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবার নিয়ে সচ্ছলভাবে দিন কাটাচ্ছেন লাল পিয়ান সাং বম।শিকড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে আসবাব

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন বছর ধরে লাল পিয়ান সাং বম পানিতে ভেসে আসা এসব শেকড়ে শৈল্পিক রূপ দিয়ে বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরি করছেন। তিনি সেগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। আর তার এ কাজে সহায়তা করছে তারই আপন ছোটভাই জিংরাম বম ও একই এলাকার খালেদ বম।

এ বিষয়ে লাল পিয়ান সাং বম বাংলা ট্রিবিউনকে  বলেন, ‘আমার ফলের বাগান আছে। ফলের বাগানের আয় দিয়ে সারা বছর চলতে পারি না। তিন বছর আগে হঠাৎ করেই আমার মাথায় আসল, পানিতে এত শেকড় ভেসে আসে তা কোনও কাজে লাগানো যায় কিনা। তখন থেকেই পানিতে ভেসে আসা শেকড় সংগ্রহ করে তা দিয়ে চেয়ার, টি-টেবিল, শো-পিস, ফুলদানিসহ নানা ধরনের আসবাবপত্র বানাতে শুরু করি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমেই বেশিরভাগ শেকড় সংগ্রহ করা হয়। এসব ভেসে আসা শেকড় কেউই সংগ্রহ করে না। রান্নার জন্যও কেউ এগুলো লাকড়ির কাজে ব্যবহার করে না। ফলে এগুলো পচে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নাই।’শিকড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে আসবাব

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের বনের মধ্যে কেটে ফেলা গাছের শেকড় বিভিন্ন  সময়  সাঙ্গু নদী দিয়ে ভেসে আসে। সেগুলো সংগ্রহ করে আকার-আকৃতি বুঝে কেটে-ছেঁটে চেহারা বদলে দেওয়া হয়। পরিণত করা হয় শিল্পকর্মে। বাড়ির আঙিনায় প্রায় তিন বছর ধরে এই ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করছি। আর এসব জিনিসপত্র দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি করে থাকি। এসব সরঞ্জাম ঢাকার বাণিজ্যমেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি। এছাড়া এ এলাকায় বেড়াতে আসা পর্যটকরাও তা কিনে নিয়ে যান।’

লাল পিয়ান সাং বম এর সহযোগী ছোটভাই জিংরাম বম বলেন, ‘ছোট কাজ হলে একদিনে শুধুমাত্র তিনটি জিনিস বানানো সম্ভব হয়। তবে বড় কাজ হলে একটি বানাতে ও তাতে নকশা দিতে তিনদিন পর্যন্ত সময় লাগে।’

লাল পিয়ান সাং বম এর আরেক সহযোগী খালেদ বম বলেন, ‘আমরা গাছের শেকড় সংগ্রহের পর তা দিয়ে চেয়ার, টি-টেবিল, শো-পিস, ফুলদানিসহ নানা ধরনের ব্যবহারের সামগ্রী তৈরি করি। পরে এগুলো বিভিন্ন এলাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক ও স্থানীয়দের কাছে দুই হাজার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। ’শিকড় দিয়ে তৈরি আসবাব

বান্দরবান বিসিক এর উপ-ব্যবস্থাপক মো. জামাল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘বান্দরবানের ৭টি উপজেলাতেই আমাদের কুটির শিল্পের কার্যক্রম চালু রয়েছে। আমরা খবর পেয়েছি, রুমা উপজেলার মুনলাই পাড়ার লাল পিয়ান সাং বম গাছের শেকড় সংগ্রহ করে তাতে বিভিন্ন রকমের ডিজাইন দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করছে। যা আকর্ষনীয় মূল্যে পর্যটকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিসিক তার এ অভিনব এবং চমৎকারভাবে নির্মিত আসবাবপত্র বিক্রিতে সহায়তা করবে। তার এ কুটির শিল্পকে নিবন্ধনের মাধ্যমে বিসিক এর আওতায় এনে ঋণ সহায়তাসহ সব ধরনের সহায়তাও দেওয়া হবে। লাল পিয়ান সাং বমকে আমাদের বিসিক এর আওতায় এনে তার এ অভিনব উদ্ভাবনী শক্তিকে সারা দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। তার তৈরি এসব আসবাবপত্রগুলো সহজেই বিক্রি করার ব্যবস্থাও করবো আমরা।’