কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা

কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাপর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাগর সৈকতসহ পুরো শহর জুড়ে গড়ে উঠেছে সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল। এসব হোটেলের অধিকাংশেই নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। কিছু কিছু হোটেলে থাকলেও তার বেশিরভাগ ত্রুটিপূর্ণ। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় হোটেলগুলো রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হবে সংশ্লিষ্টদের। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের এমন তথ্য উঠে এসেছে। এসব হোটেল মালিকদের দ্রুত হোটেলগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পর্যটক আসেন বছরজুড়ে। এই পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে সাগরপাড় সহ শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি সাড়ে চার শতাধিকেরও বেশি হোটেল-মোটেল। কিন্তু এসব হোটেল-মোটেলগুলোতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। নামমাত্র অনুমোদন নিয়ে এসব হোটেল গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ এই কক্সবাজারের সৌন্দর্য্য বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে বর্তমান সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পর্যটন শিল্প বিকাশে কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পট মেগা প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসে কাজ শুরু করেছে সরকার। এসব মেগা প্রকল্পের কাজ করতে ইতোমধ্যে বিশ্বের নামিদামী ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকৌশলীরা কক্সবাজারের এসব হোটেলে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্প কক্সবাজারে হওয়ায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কর্মকর্তারাও এখানে এসব হোটেলে অবস্থান করেন। অর্থাৎ বিশ্বের নানাপ্রান্তের মানুষে ভরপুর রয়েছে কক্সবাজারের এসব হোটেল-মোটেলগুলো।কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলোর অধিকাংশে ফায়ার ফাইটিং প্ল্যান নেই। অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডার আছে অপর্যাপ্ত। এলপি গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হচ্ছে যত্রতত্র। ওয়ার্টার রিজার্ভে পর্যাপ্ত পানি থাকছে না। জরুরি মুহূর্তে বের হওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই হোটেল রুমগুলো থেকে। এ কারণে প্রতিমুহূর্তে ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশ-বিদেশের লাখো পর্যটক।  

সম্প্রতি রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নড়ে চড়ে বসেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কক্সবাজারে গড়ে উঠা এসব হোটেলগুলোতে শুরু করেছে অভিযান। জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত ১ এপ্রিল অভিযান চালিয়ে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন হোটেলকে জরিমানা করা হয়েছে ৩ লাখ টাকা। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ক্রটি থাকায় সি ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্টকে ৫০ হাজার, বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজকে ৩০ হাজার ও ওয়েন্ডে ট্রেসকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ক্রটি সাড়িয়ে নিতে ২০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। অভিযানের নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম শেখ।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম শেখ বলেন, ‘সারাদেশে যেভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে তাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জেলা প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে। যদি কেউ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ক্রটি রাখে শুধু জরিমানা নয় আইনি শাস্তিও দেওয়া হবে। শুধু কয়েকটি হোটেল নয়, প্রত্যেক হোটেলে এ অভিযান পর্যায়ক্রমে চালানো হবে।’c2

কক্সবাজারে গড়ে উঠা বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মোটামুটি সবকিছু ঠিক রয়েছে। রিজার্ভে পানি ও অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডারের সংখ্যাটা কম ছিল। আমরা দ্রুত সেটিও কার্যকর করে নেব। আশা করি আমাদের হোটেলে কোনও নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে না।’

সি ওয়ার্ল্ড রির্সোটের নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেভাবে সব হোটেলে করলে ভালো হয়। কারণ দুর্ঘটনা যে কোনও স্থানে ঘটতে পারে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এটা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া দরকার।’

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক পারভেজ মাহতাব বলেন, ‘আমরা কক্সবাজারে ভ্রমণে আসি আনন্দ বা একটু সময় কাটাতে। সারাদেশের যে অবস্থা, এরকম কিছু কক্সবাজারে ঘটলে কী অবস্থা সৃষ্টি হবে আল্লাহই জানেন। এখন থেকে হোটেল মালিকদের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। কারণ দুর্ঘটনা কাউকে বলে কয়ে আসবে না।’

আরেক পর্যটক দম্পতি শেলী চৌধুরী ও সালমান রেজা বলেন, ‘অনেক হোটেলে এত ছোট সিঁড়ি। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে বের হওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত বড় সিঁড়ি বা বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় এসব হোটেল থেকে মানুষের বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে কোনও দুর্ঘটনার সময়।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসসহ সব ডিপার্টমেন্টকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনও হোটেল বা বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় যাতে ক্রটি না থাকে সেজন্য সতর্ক করা হয়েছে। সব হোটেল-মোটেলকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হবে। অন্যথায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’