নুসরাত হত্যা

হাসিমুখে এজলাসে ঢুকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয় দণ্ডিতরা, করে গালাগালও

প্রিজনভ্যানে কাঁদছে এক দণ্ডিত (ছবি– ফোকাস বাংলা)

যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদের কারণে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বেশিরভাগ আসামি আজ বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) হাস্যোজ্জ্বল মুখে এজলাসে প্রবেশ করে। রায় ঘোষণার পর অবশ্য তাদের কাঁদতে দেখা যায়।

এদিন বেলা পৌনে ১১টার দিকে নুসরাত হত্যা মামলার আসামিদের জেলা কারাগার থেকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এ সময় ওই দৃশ্য দেখা যায়।

বেলা ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে রায় পড়া শুরু করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। ১৭২ পৃষ্ঠার রায়ের চুম্বক অংশ শোনার পরই আসামিরা চিৎকার শুরু করে; কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ে। এজলাস থেকে আসামিদের জেলা কারাগারে ফেরত নেওয়ার সময়ও তাদের কাঁদতে দেখা যায়।

রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত আফসার উদ্দিন উপস্থিত সাংবাদিক ও বাদীপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ করে গালিগালাজ করে; আসামি শামীমও গালমন্দ করে। অন্য দণ্ডিতরা উচ্চ আদালতে আপিল করবে বলে চিৎকার করতে থাকে। পরে পুলিশি পাহারায় সাংবাদিক ও আইনজীবীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় আসামি আবদুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, “কেয়ামতের দিন তোদের বিচার হবে।” আর নুসরাতের বড় ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানকে মুক্তি পেয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় আসামি আফসার। নোমানকে উদ্দেশ করে আফসার বলে, “তোর বোন অগ্রযাত্রা করেছে। তোরা হত্যা বলে চালিয়ে দিয়ে এতগুলো মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছিস। এর শেষ কোথায়, দেখে নেবো।’

প্রিজনভ্যান থেকে দণ্ডিতদের কান্নার শব্দ ভেসে আসে (ছবি– ফোকাস বাংলা)

এ ঘটনার পর নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘রায়ের পরপর আদালত চত্বরেই আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে।’ তবে রায়ে সন্তুষ্ট নোমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হাফেজ আহমেদ বলেন, ‘এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে খুশি।’ বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজুও বলেন, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

তবে বিবাদীর আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু বলেন, ‘আসামিরা ন্যায়বিচার পায়নি, আমরা আপিল করবো।’ সাত কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করা যাবে বলেও জানান তিনি।

নুসরাতের সহপাঠী নাসরিন সুলতানা ফুর্তি বলেন, ‘আমার বান্ধবীর হত্যাকারীদের ফাঁসি হওয়ায় খুশি হয়েছি। আমিও অধ্যক্ষের রোষানলে পড়ি। রাফিকে জানিয়েছিলাম। রাফি ছিল সাহসী। কোনও অন্যায় মেনে নিতে পারতো না।’

বেলা ১১টা ২১ মিনিটে এ রায় ঘোষণা করেন বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। রায়ে নুসরাত জাহান রাফিকে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একইসঙ্গে আসামিদের প্রত্যেককে একলাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এই টাকা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দেওয়ার আদেশও দেওয়া হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হলো—সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

আদালতে নেওয়া হচ্ছে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে (ছবি– ফোকাস বাংলা)

নুসরাত হত্যা মামলায় বাদীপক্ষে ছিলেন বিচারিক আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর হাফেজ আহমেদ, অ্যাডভোকেট আকরামুজ্জামান ও অ্যাডভোকেট এম শাহজাহান সাজু। আর আসামিপক্ষে ছিলেন হাইকোর্টের আাইনজীবী অ্যাডভোকেট ফারুক আহমেদ ও এনামুল হক, ফেনী আদালতের সিনিয়র আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, নূরুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দিন নয়ন ও মাহফুজুল হক, আহসান কবির বেঙ্গল, সিরাজুল হক মিন্টুসহ ২০ জন আইনজীবী।

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ওই মাদ্রাসার কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যায়। এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।