কৃষকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিচিমুক্ত পেয়ারা

গাছে শোভা পাচ্ছে বীজমুক্ত পেয়ারাকাপ্তাইয়ের রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণায় বীজমুক্ত (বিচিবিহীন) পেয়ারার নতুন জাত উদ্ভাবন করে সফলতা অর্জন করেছে। উদ্ভাবিত নতুন জাতের এই পেয়ারার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বারি পেয়ারা-৪’। জাতটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হলে দেশে পেয়ারা চাষে নতুন বিপ্লব আসবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফলের ১৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে।

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা সাত বছরের চেষ্টায় এটি  উদ্ভাবন করেছেন। বীজমুক্ত পেয়ারাটি দেখতে লম্বাটে এবং পুরোটাই খাওয়ার উপযুক্ত। অমৌসুমি ফল হিসেবে দেশের বাজারে সব সময় এ পেয়ারা পাওয়া যাবে। উচ্চ ফলনশীল এই ফলটি খুবই সুস্বাদু। নাশপাতি এবং আপেলের বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এটি।

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্র জানায়, উদ্ভাবিত ‘বারি পেয়ারা-৪’ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফল। সব রকমের মাটিতেই চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ থেকে ভারী এঁটেল মাটি, যেখানে পানি নিষ্কাশনের বিশেষ সুবিধা আছে সেখানে ভালো জন্মে। আকার ৭ দশমিক ১৪ থেকে ১০ দশমিক ১৪ সেন্টিমিটার। গড় ওজন ২৮৪ গ্রাম এবং টিএসএস শতকরা ৯ দশমিক ৫ ভাগ। ফলটি ৮-১০ দিন পর্যন্ত সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। বছরে প্রতি হেক্টরে ৩২ টন ফলন হয়। এই জাতের পেয়ারায় রোগবালাইয়ের আক্রমণ তেমন পরিলক্ষিত হয় না। তবে ছাতরা পোকার আক্রমণ দেখা যায় মাঝে মধ্যে। আক্রমণের প্রথম অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করে ধ্বংস করতে হয়।

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালী এলাকার কৃষক মো. হারুন মিয়া জানান, পাহাড়ে অনেক রকম ফলের ফলন হলেও বীজহীন পেয়ারার কথা প্রথম শুনলাম। সারা বছরই এ পেয়ারা বাজারে বিক্রি করা যাবে, বিষয়টি আমাদের আশাবাদী করছে।

বীজমুক্ত পেয়ারা কেটে প্লেটে রাখা হয়েছে রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলতাফ হোসেন জানান, দেশে সারা বছরই কম বেশি পেয়ারা চাষ হলেও নতুন উদ্ভাবিত এ জাত মূলত গ্রীষ্মকালীন ফল। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে কোনও বীজ থাকে না। সেপ্টেম্বর মাসে যখন দেশে পেয়ারাসহ অন্য ফল তেমন পাওয়া যায় না, তখন এটির আহরণ শুরু হয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আহরণ করা গেলেও অমৌসুমি ফল হিসেবে দেশের বাজারে সব সময় থাকবে। এটি পার্বত্য এলাকাসহ সারা দেশে চাষের উপযোগী।

রাঙামাটি রাইখালী, পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, গত তিন বছর ধরে সারা দেশের হার্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে মাতৃ চারা গাছ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে ওইসব মাতৃগাছ দিয়ে চারা উৎপাদন করা যাবে। তখন কৃষকদের ব্যাপক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

রাঙামাটি বনরূপা, হর্টিকালচটার সেন্টারের উপ-পরিচালক, ড. আব্দুল জব্বার বলেন, কৃষকদের মাঝে এই জাতটি ছড়িয়ে দিতে নতুন আরেকটি মাতৃ বাগান সৃষ্টি করেছি। আশা করছি আগামী বছর থেকে কৃষকদের মাঝে এই চারা বিতরণ করা সম্ভব হবে। আগাম ফলন হওয়ায় পেয়ারার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখছেন এই কর্মকর্তা।  

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা জানান, যখন সারা দেশে কোনও ফল পাওয়া যায় না তখনও এই বীজমুক্ত পেয়ারাটি পাওয়া যাবে। এজন্য কৃষক পর্যায়ে এই ফলের ব্যাপক চাহিদা থাকবে। বীজমুক্ত হওয়ায় এর দামও ভালো পাবেন কৃষকরা।