কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক সমুদ্র উপকূলে ট্রলার থেকে উদ্ধার ১০ লাশের পরিচয় মিলেছে। তারা সবাই মহেশখালী ও চকরিয়ার বাসিন্দা। এর মধ্যে ট্রলারের মালিক মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের সামশুল আলমও আছেন।
রবিবার বিকাল ও সন্ধ্যায় সদর হাসপাতালের মর্গে এসে স্বজনরা তাদের লাশ শনাক্ত করেন। তারা হলেন হোয়ানক ইউনিয়নের ছনখোলা পাড়ার রফিক মিয়ার ছেলে ট্রলার মালিক সামশুল আলম (২৩), শাপলাপুর ইউনিয়নের মিটাছড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (১৮), জাফর আলমের ছেলে সওকত উল্লাহ (১৮), মুসা আলীর ছেলে ওসমান গনি (১৭), সাহাব মিয়ার ছেলে সাইফুল্লাহ (২৩), মোহাম্মদ আলীর ছেলে পারভেজ মোশাররফ (১৪), মোহাম্মদ হোসাইনের ছেলে নুরুল কবির (২৮), চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের কবির হোসাইনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৩৪), শাহ আলমের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান (৩৫) ও চকরিয়া পৌরসভার চিরিঙ্গা এলাকার জসিম উদ্দীনের ছেলে তারেক জিয়া (২৫)।
এর আগে রবিবার সকালে রশি দিয়ে ট্রলারটি টেনে মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে নিয়ে আসেন স্থানীয় জেলেরা। খবর পেয়ে দুপুর ২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।
এদিকে, ঘটনা ঘিরে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পূর্বশত্রুতার জেরে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আবার গভীর সাগরে ১০ জেলেকে হত্যা করে ট্রলারটি ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে জলদস্যুরা। দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ।
তবে স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, সাগরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ফিশিং বোট মালিকদের একটি গ্রুপের সঙ্গে সামশুল আলমের বিরোধ আছে। সেই ঘটনার জেরে এই ঘটনা ঘটতে পারে।
তারেক জিয়ার লাশ শনাক্ত করেন তার মা জোছনা বেগম। তিনি হাসপাতাল চত্বরে বলেন, আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। ৭ এপ্রিল ইফতারের পর বটতলি স্টেশনে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল।
পরে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি একই এলাকার সাইফুল্লাহ ও শাহজাহান নিখোঁজ আছে। আজ তিন জনের লাশ একসঙ্গে পেয়েছি। আমার ছেলে কীভাবে সাগরে গেলো, কারা নিয়ে গেলো, তা আমি জানি না।
সন্ধ্যায় সদর হাসপাতালের মর্গে সামশুল আলমের পরিচয় শনাক্ত করেন তার স্ত্রী রোকেয়া আক্তার। বাকিদের লাশও শনাক্ত করেন স্বজনরা। চেহারা বিকৃত হলেও পরনের পোশাক ধরে বাকি লাশের পরিচয় শনাক্ত করেন তারা।
অবশ্য এটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখছে পুলিশ, এমনটি জানিয়েছেন সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রলারের বরফ রাখার কক্ষে ১০ জেলেকে রাখা হয়েছে। হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। কয়েকজনের শরীরে জাল প্যাঁচানো ছিল। একটি লাশের গলা থেকে মাথা ছিল বিচ্ছিন্ন। আরেকটি লাশের হাত বিচ্ছিন্ন ছিল। লাশগুলো ট্রলারের যে কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেই কক্ষের দরজা পেরেক দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল। এসব দেখে বোঝা যায়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
গত ৭ এপ্রিল রাতে ওই ট্রলারটি ডুবিয়ে দেওয়ার কথা শুনেছেন বলে জানালেন হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, শুনেছি ৭ এপ্রিল রাতে সামশুল আলমের মালিকানাধীন একটি ট্রলার ১১ জন জেলেকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে নেমেছিল। দুদিন পর জানতে পারি, ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারা, কেন ট্রলারটি ডুবিয়ে দিয়েছিল, তা তখন নিশ্চিত হতে পারিনি।
এ ব্যাপারে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, সবগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ ও পিবিআই। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাদের নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন হবে।
আরও পড়ুন: