চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ জাহিদুল হক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। চিন্ময় দাসসহ এ মামলায় গ্রেফতার ২৩ জন আসামিকে আদালতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে হাজির করা হয়।
আলিফ হত্যা মামলার আইনজীবী ও চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। ওই দিন মামলার বাদী সাক্ষ্য দেবেন।
আলোচিত এই হত্যা মামলার চার্জ গঠনের শুনানিকে ঘিরে চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় সকাল থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মূল ফটকে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। এতে আদালতের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষকে। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে চিন্ময়সহ এই মামলার ২৩ আসামিকে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাকি ১৬ জন পলাতক।
শুনানিতে চিন্ময়কে নির্দোষ দাবি করে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য আবেদন করেন তার আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানায়। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।
এদিকে আদালতে হাজির হয়ে আইনজীবী সাইফুলের বাবা জামাল উদ্দিন ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, আসামিদের বিচার শুরুর আজ আদেশ হয়েছে, আমি এতে খুশি। বিচারটি যাতে দ্রুত সময়ে শেষ হয়, ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাতে আমি মরতে পারি।
চার্জ গঠনের শুনানিতে আলিফ হত্যা মামলার আইনজীবী ও চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী আদালতকে বলেন, এটি একটি সংবেদনশীল, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। যা দেশের জনগণ, আইনজীবী সমাজ, বিচারপ্রার্থী মানুষ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রপক্ষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, উপস্থাপিত প্রমাণাদির আলোকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী আইনজীবী আলিফ হত্যাকাণ্ডের সহযোগিতাকারী ও প্রত্যক্ষ উসকানিদাতা। তার নির্দেশ ও প্ররোচনায় অন্য আসামিরা সংঘবদ্ধভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। আসামিদের এই কার্যকলাপ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩০২/১০৯/৩৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ। আদালত শুনানি শেষে আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর বিরুদ্ধে ৩০২/১০৯ দণ্ডবিধি এবং অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে ১৪৭/৪৪৮/৪৪৯/৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি ধারায় চার্জ গঠন করা হয়।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, মামলার এজাহার, চার্জশিট, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত (ধারালো অস্ত্র, লাঠি, রড প্রভৃতি), সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি—এসব উপাদানসহ বিচার বিশ্লেষণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।
চার্জশিটে আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- চন্দন দাশ মেথর, রিপন দাশ, রাজীব ভট্টাচার্য্য, শুভ কান্তি দাশ, আমান দাশ, বুঞ্জা, রনব, বিধান, বিকাশ, রমিত প্রকাশ দাস, রুমিত দাস, নয়ন দাশ, ওমকার দাশ, বিশাল, লালা দাশ, সামীর, সোহেল দাশ, শিব কুমার, বিগলাল, পরাশ, গণেশ, ওম দাস, পপি, অজয়, দেবী চরণ, দেব, জয়, লালা মেথর, দুর্লভ দাস, সুমিত দাশ, সনু দাস, সকু দাস, ভাজন, আশিক, শাহিত, শিবা দাস ও দ্বীপ দাস। এ মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ২৩ আসামি কারাগারে থাকলেও এখনও ১৬ জন আসামি পলাতক।
২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও ইসকনের বহিষ্কৃত নেতা চিন্ময় দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। পরদিন ২৬ নভেম্বর তাকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হয়, আদালত জামিন মঞ্জুর না করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সে সময় চিন্ময় দাসের অনুসারীরা তার মুক্তির দাবিতে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং তাকে কারাগারে নেওয়ায় বাধা দেন।
পরে বিক্ষোভকারীরা আদালত চত্বরে বেশ কয়েকটি গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং কোর্ট বিল্ডিং কমপ্লেক্সের নিচতলায় অবস্থিত একটি চেম্বার ভাঙচুর করেন।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে আদালতের বিপরীত পাশে রঙ্গম কনভেনশন সেন্টার এলাকায় অবস্থানরত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে হত্যার উদ্দেশে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী চন্দন, রুমিত দাস, সুমিত দাস, গগন দাস, নয়ন দাস, বিশাল দাস, আমান দাস, সুকান্ত, গণেশসহ তাদের সহযোগীরা আলিফকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানায় ৩১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
২০২৫ সালের ১ জুন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান ৩৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেন।
গত ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালত চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা শুনানি শেষে ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন।