কমে আসছে অপরিশোধিত তেলের মজুত, চলবে কত দিন 

অপরিশোধিত তেলের সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। প্রতিষ্ঠানটির হাতে বর্তমানে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত আছে মাত্র ৪০ হাজার টন। যা দিয়ে চলবে আগামী ১০ থেকে ১২ দিন। দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ টন করে তেল পরিশোধন করা হচ্ছে। পরিশোধিত এসব তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে। 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৌশলগত এই নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও। যদিও গতকাল চলমান যুদ্ধের মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের জাহাজ চলাচলে অভয় দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এই জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এই বন্ধুতালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১ অথবা ২ মে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বহন করা জাহাজ দেশে প্রবেশ করতে পারে। জাহাজটিতে আগামী ২১ এপ্রিল সৌদি আরবের একটি বন্দর থেকে তেল লোড করার শিডিউল রয়েছে। সেটি বর্তমান সময়ের বিপজ্জনক রোড হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে বিকল্প রোডে দেশে আসার কথা রয়েছে। যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে বাধা নেই বলছে ইরান। 

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত একটি মাদার ভেসেল সৌদি আরবের রাস তানুয়া বন্দরে আটকা পড়েছে। এমটি নর্ডিক পলাঙ নামের জাহাজটি গত ২ মার্চ সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই জাহাজটিতে ক্রুড অয়েল লোড করা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটি এখনও বন্দরে নোঙর করে আছে। 

আগামী ২১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত জেবেল আলী ধান্না বন্দর থেকে আরেকটি জাহাজে ক্রুড অয়েল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার শিডিউল ছিল। ওই জাহাজটিতেও এক লাখ টন তেল আনার কথা ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটিরও শিডিউল বাতিল করা হয়। 

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) পরিশোধন করা হয়। অপরিশোধিত তেল থেকে পরিশোধনের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, জেট ফুয়েল ও বিটুমিন। তবে অকটেন এই প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন করা হয় না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিং) মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমরা রিসিভ করেছি। সেগুলো পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধ করা হচ্ছে এই কারখানায়। বর্তমানে কারাখানায় অপরিশোধিত তেলের সংকট আছে।”  

তিনি আরও বলেন, “ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য আমদানির এক লাখ টন তেল ভর্তি জাহাজ অপেক্ষা করছে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে। ২ মার্চ সকালে জাহাজটি দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সেটি আটকা পড়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে জাহাজটি দেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। এ ছাড়া আরব আমিরাত থেকে আরও এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১ মার্চ দেশের উদ্দেশে আরও একটি জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা ছিল। সেটির শিডিউল বাতিল করা হয়। নতুন করে আরও একটি জাহাজে আগামী ২১ এপ্রিল তেল লোড করার শিডিউল আছে। সেটি নির্দিষ্ট সময়ে তেল লোড করলে আগামী ১ অথবা ২ মে দেশে পৌঁছাবে। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ দিন লাগে।” 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, “বর্তমানে ৪০ হাজার মেট্রিক টন কাঁচামাল অর্থাৎ অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত আছে। যা দিয়ে আগামী ১০-১২ দিন চলবে। এরপর অপরিশোধিত তেলের সংকটে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের একমাত্র পরিশোধনাগার।” 

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মুহাম্মদ মামুনুর রশীদ খান বলেন, “মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়াসহ বিকল্প দেশ থেকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল কেনার চেষ্টা চলছে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ ক্রুড অয়েলের নমুনা পাঠিয়েছে। আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে কয়েকটি থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে সেগুলো কিনলে আসতে একটু সময় লাগবে।”