ধসে পড়ার ঝুঁকিতে হাতিয়ার একমাত্র সেতু, আতঙ্কে স্থানীয়রা

ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় যাওয়ার একমাত্র সেতু। যানবাহন উঠলেই সেতু কেঁপে ওঠে। বিকল্প উপায় না থাকায় লাখো মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে এটি দিয়ে চলাচল করতে হয়।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে সেতুটি। এতে উপজেলার সাত লাখ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সেতু ভেঙে পড়লে ঘটবে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

উপজেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাতিয়া উপজেলায় অন্তত ৭ লাখ লোকের বসবাস। এতোদিন সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন খুব একটা চলাচল করতো না। কিন্তু গত ৩১ জানুয়ারি হাতিয়ার চেয়ারম্যানঘাট-নলচিরা নৌপথে ফেরি চালু হওয়ার পর পণ্যবাহী ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। এর প্রভাবেই অল্প সময়ের মধ্যে সেতুটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়।

জেলা শহর থেকে সড়কপড়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পার হয়ে তারপর নৌপথে ২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয়ে এখানে। সড়কপথে জেলা শহর থেকে কেবলমাত্র একটি রাস্তা থাকায় ভিন্ন কোনও মাধ্যমে এখানে যাতায়াতের সুযোগ নেই। সম্প্রতি উপজেলার সীমান্তে ভূঁইয়ারহাট সংলগ্ন ৪ নম্বর স্টিমার ঘাট সেতুটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি দিয়ে পার হয় শত শত যানবাহন। যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার শঙ্কায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) দুই পাশে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে। এতে লেখা রয়েছে—পাঁচ টনের বেশি ওজনের যান চলাচল বন্ধের নোটিশ। তবে বাস্তবে ১৫ থেকে ২০ টন ওজনের যানবাহনও নির্বিঘ্নে সেতুটি পার হচ্ছে।

সরেজমিন সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যানজট নিয়ন্ত্রণে চার জন গ্রাম পুলিশ সেতুর দুই পাশে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৪৯ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটিতে মোট ৪২টি পিলার রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি পিলারের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় কংক্রিট খসে পড়ে ভেতরের রড বেরিয়ে এসেছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেও নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল করছে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন সাধারণ মানুষজন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে সেতু পার হই। কখন ভেঙে পড়ে এই আতঙ্কে থাকতে হয়। এটি হাতিয়ায় যাওয়ার একমাত্র সেতু। এটি ভেঙে গেলে সাত লাখ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো আমরা। সড়কপথে চলাচলের কোনও উপায় থাকবে না।’

অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে খুব ভয় লাগে। কিন্তু বিকল্প রাস্তা নেই। এই সেতু ছাড়া আমাদের চলার উপায়ও নেই। বাধ্য হয়েই চলাচল করি। সেতুটি ভেঙে পড়লে আমাদের আয় রোজগারও বন্ধ হয়ে যাবে।’

স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী মো. আরমান বলেন, ‘সেতুটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি হাতিয়ার অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাণরেখা। এটি ভেঙে পড়লে পুরো উপজেলা অচল হয়ে যাবে।’

যানবাহন উঠলেই সেতু কেঁপে ওঠে

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহর নোয়াখালী থেকে সড়ক যোগাযোগের জন্য কার্যত একটি মাত্র সড়ক ও এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল সাত লাখ মানুষ। ২০০১ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০০৩ সালে শেষ হয়। ১৪৯ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটিতে মোট ৪২টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ২০টির বেশি পিয়ারে ফাটল দেখা দিয়েছে। পিয়ারক্যাপ ও গার্ডারের মাঝামাঝি বিয়ারিং প্যাডগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে আছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের পণ্য আনা-নেওয়া এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। এটি ভেঙে গেলে বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।’

স্থানীয় লোকজন জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হাতিয়ার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের ফেরি যোগাযোগ চালু হওয়ায় সেতু দিয়ে ভারী যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে সেতুটির ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে সেতুটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে আছে। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘সেতুটির অবস্থা আমরা গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছি। এটি ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সময়ের মধ্যে সাময়িক সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি এখানে একটি নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে আমাদের।’