যেখানে জন্ম, সেখানেই থামলো জীবন গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমির

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে যেখানে ১১ বছর আগে পৃথিবীতে আগমন হয়েছিল রেশমি আক্তারের, সেই হাসপাতালেই শেষ হয়ে গেলো তার জীবন। দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়ে আইসিইউতে দীর্ঘ লড়াই শেষে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল পৌনে ১০টায় না ফেরার দেশে চলে যায় ১১ বছর বয়সী এই শিশু।

এর আগে, গত ৭ মে রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয় ১১ বছর বয়সী রেশমি। তার মৃত্যুতে পরিবারসহ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সকালে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মা-বাবাসহ স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।    

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি গুলি তার কানের নিচ দিয়ে ঢুকে মাথায় আটকে ছিল। এ কারণে সে ‘ব্রেন ডেড’ ছিল। হাসপাতালে ভর্তির পর তার মস্তিষ্ক কাজ করেনি, এমনকি জ্ঞানও ফেরেনি। কৃত্রিম লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।’

নিহত রেশমির বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বোনের জন্ম হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালেই আজ তার মৃত্যু হলো। আমার বোন অনেক কষ্ট পেয়ে মারা গেছে। তার মাথার ভেতরে গুলি ছিল।’

আজ এশার নামাজের পর বায়েজিদ রৌফবাদ এলাকায় নামাজে জানাজা শেষে রেশমিকে দাফন করা হবে বলে জানান তার এই ভাই।

রেশমির মৃত্যুর খবরে হাসপাতালের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তার প্রতিবন্ধী বাবা রিয়াজ আহমেদ ও মা সাবেরা বেগম। তারা দুজনই বাকরুদ্ধ। সাবেরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ে তো কোনও দোষ করেনি। সে কেন এত বড় শাস্তি পেলো। আমার মেয়েকে যারা মেরেছে আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘কারা কেন আমার মেয়েকে গুলি করেছে তা আমি জানি না। তাদের চিনিও না। প্রশাসন নিশ্চয় তাদের খুঁজে বের করবে।’

বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন রৌফাবাদ কলোনির হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী সবজি বিক্রেতা রিয়াজ আহমেদ প্রকাশ গুড্ডুর মেয়ে রেশমি। দুই ছেলে ও তিন মেয়ে মিলে পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট সে। স্থানীয় ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো রেশমি।

৭ মে রাতে দোকানে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয় রেশমি। পথে দুর্বৃত্তদের গুলির মাঝে পড়ে যায় সে। একটি গুলি তার চোখের নিচ দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতরে আটকে যায়। একই ঘটনায় নিহত হন হাসান ওরফে রাজু (৩২) নামের এক যুবক। রাজু রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। ওই উপজেলায় সম্প্রতি নাছির নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় হওয়া মামলায় তাকেও আসামি করা হয়। এরপর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেয় রাজু।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মে রাতে রেশমির মা তাকে পাশের দোকানে পান কিনতে পাঠান। দোকান থেকে ফেরার সময় হঠাৎ কলোনির গলিতে গোলাগুলি শুরু হয়। আতঙ্কিত মানুষ ছুটোছুটি শুরু করলে গুলির মাঝখানে পড়ে যায় রেশমি। মুহূর্তেই একটি গুলি এসে লাগে রেশমির চোখের নিচে। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউ সাপোর্টের কথা জানান। কিন্তু তখন চমেকে আইসিইউ বেড খালি না থাকায় স্বজনরা গভীর রাতে তাকে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

রেশমির বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘৭ মে রাতে তাকে চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আইসিইউ ছাড়া তাকে বাঁচানো কঠিন। তাই রাত ১২টার দিকে তাকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ছিল। পরে চমেকে বেড খালি হলে আবার সেখানে নিয়ে আসি।’