হামের পর এবার ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ নগরী। ঘরে ঘরে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হলেও রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, ওয়ার্ডের ভেতরে তো নয়ই, বারান্দা কিংবা হাসপাতালের বাইরেও মিলছে না জায়গা। চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-হতাশা।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬০৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে মধ্যে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২৮ জন ডেঙ্গু রোগী।
ঘরে ঘরে রোগী
নগরীর সেহড়া এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের স্কুলপড়ুয়া ছেলে রাফিদুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। থ্যালাসেমিয়ার কারণে প্রতি মাসে তার শরীরে এবি নেগেটিভ রক্ত দিতে হয়। এর মধ্যে গত ২৯ আগস্ট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয় রাফিদুল। হাসপাতালে ভর্তির পর রক্ত পরীক্ষায় তার প্লাটিলেটের মাত্রা অনেক কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে এখন তাকে রক্ত দিতে হচ্ছে।
থ্যালাসেমিয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় ছেলের শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন আব্দুর রহিম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়ার জন্য শরীরে প্রতি মাসেই রক্ত দিতে হয়। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় জটিল অবস্থা ধারণ করেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী যেভাবে মারা যাচ্ছে, তাতে করে আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো কি না, আল্লাহই ভালো জানেন।’
তিনি আরও জানান, তার বাসার আশপাশের অনেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। গত দুই মাসে ময়মনসিংহ নগরী ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠেছে। কমবেশি সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন।
শুধু রাফিদুল নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই পরিবারের দুই-তিন জন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান স্থানীয় লোকজন।
নগরীর বাউন্ডারি রোড এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর নোংরা-ময়লার কারণে এডিস মশা জন্ম নেওয়ার সুযোগ হয়েছে বেশি। আর এ কারণেই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষ যেমন সচেতন না, তেমনি সিটি করপোরেশনের উদ্যোগও তেমন একটা দেখা যায় না। ঠিকমতো মশার ওষুধ দিচ্ছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় এডিস মশা বেশি বেশি জন্ম নেয়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
রোগীর চাপে হাসপাতালেও সংকট
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের তৃতীয় তলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর কারণে ওয়ার্ডের ভেতরে-বাইরে কোথাও জায়গা নেই। বর্তমানে ১২৮ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরপরও আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
মশা নির্মূলে উদ্যোগের দাবি
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এস কে দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এডিস মশা নির্মূলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফগার মেশিন ব্যবহার করে এডিস মশা নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে।’
ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই ঊর্ধ্বগতি শুধু ময়মনসিংহ নগরীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে না, একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতার ঘাটতিও সামনে আনছে। একদিকে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, অন্যদিকে হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসাসেবায় তৈরি হচ্ছে চাপ। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন নগরীর বাসিন্দারা।









