হোটেলের বুকিং বাতিল করে কেন কক্সবাজার ছাড়ছেন পর্যটকরা

তীব্র গরমে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে হোটেল ছেড়ে কক্সবাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একইভাবে যেসব হোটেলে আগে থেকে বুকিং হয়েছিল, তাদের অনেক হোটেলের বুকিং বাতিল করা হচ্ছে। 

একাধিক পর্যটকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে কক্সবাজার ছাড়ছেন পর্যটকরা। একইসঙ্গে আগাম বুকিং দেওয়া হোটেলের কক্ষ বাতিল করছেন তারা।

এতে করে হোটেলের মালিকরা পড়েছেন বেকায়দায়। তারা বলছেন, গরমের কারণে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ হোটেলের ভাড়া কমিয়েও পর্যটক টানতে পারছেন না। তীব্র গরমের কারণে পর্যটকরা থাকতে চাচ্ছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারে গত কয়েকদিন ধরে চলছে তীব্র তাপদাহ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিমাত্রায় লোডশেডিং। দিনে ও রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় হোটেল-মোটেল জোনের পরিবেশ ও জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতির কারণে পর্যটকরা তড়িঘড়ি করে কক্সবাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যান্য সময়ে সাপ্তাহিক ছুটিতে যে হারে পর্যটকের দেখা মিলতো এখন সৈকতজুড়ে সুনসান নীরবতা। অথচ অন্যান্য সময়ে এই মৌসুমে পর্যটকদের যে উপচে পড়া ভিড় থাকে, তীব্র গরমের কারণে তা এখন অনেকটাই ম্লান। 

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আজ কক্সবাজারের দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। রাতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকতে পারে। বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে গরমের অনুভূতি বেশি হচ্ছে। এর আগের দিন শুক্রবারও একই অবস্থায় ছিল।

শনিবার (০৬ জুন) দুপুরের কড়া রোদে সৈকতের বালুকারাশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় সুগন্ধা, লাবণী বা কলাতলী পয়েন্টে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বিকালের দিকে কিছু মানুষ সৈকতে নামলেও তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার কারণে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। আবার হোটেলে গিয়েও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

হোটেল-মোটেল জোনের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) কাজ করছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দিতে জেনারেটর চালু রাখলেও অতিরিক্ত লোডের কারণে জেনারেটরগুলো ঘন ঘন বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে ভ্যাপসা গরমে হোটেলের রুমের ভেতর অবস্থান করা পর্যটকদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় তারা বুকিং বাতিল করে ফিরে যাচ্ছেন।

কক্সবাজারে বেড়াতে আসা মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে শখ করে চার দিনের জন্য কক্সবাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা ভাবতে পারিনি। দিনে-রাতে অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। হোটেলের এসি তো দূরের কথা, জেনারেটর দিয়ে ফ্যান চালালেও রুম ঠান্ডা হচ্ছে না। গরমে রাতে ঘুমাতেও পারছি না। বাইরে যে যাবো, দুপুরের রোদে সৈকতের বালিতে পা দেওয়া যাচ্ছে না। ঘোরার আনন্দ তো দূরে থাক, এখন অসুস্থ হওয়ার ভয়ে বুকিংয়ের দুই দিন বাকি থাকতেই আজ রাতের বাসে ঢাকা ফিরে যাচ্ছি।’

একই ভোগান্তির কথা জানালেন চট্টগ্রাম থেকে আসা জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাচ্চাদের স্কুল ছুটির কারণে পরিবারসহ এসেছিলাম একটু স্বস্তির খোঁজে। কিন্তু এসে দেখি উল্টো খারাপ অবস্থা। কাল রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর হোটেলের জেনারেটরও নষ্ট হয়ে যায়। চার বছরের বাচ্চাকে নিয়ে ভ্যাপসা গরমে সারারাত হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়েছে। লিফটে উঠতে ভয় লাগছে, কখন বিদ্যুৎ গিয়ে আটকে যাই। সাগরের বাতাসও এখন প্রচন্ড গরম। এখানে এসে এক মুহূর্তও শান্তি পাচ্ছি না, তাই বাধ্য হয়ে হোটেলের বাকি টাকা পরিশোধ করে আজ বিকালেই চেক-আউট করে বাড়ির পথ ধরেছি।’

হোটেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসায়িক মন্দার মুখে পর্যটকদের ধরে রাখতে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলো নানা ধরনের বিশেষ ছাড় এবং অফার ঘোষণা করলেও তীব্র গরমের সামনে তা কাজে আসছে না। পর্যটক কমে যাওয়ায় সৈকতের কিটকট (ছাতা) ব্যবসায়ী, ছবিয়াল, ঘোড়াচালক এবং ঝিনুক ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন।

গরমের কারণে পর্যটকরা নির্ধারিত সময়ের আগে কক্সবাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এবং যারা আসার কথা তারাও বুকিং বাতিল করছেন বলে জানালেন কলাতলী মেরিন ড্রাইভ সড়ক হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসার ইতিহাসে এমন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানি খরচের মুখে খুব কমই পড়েছি। তীব্র গরমের এই সময়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। পর্যটকদের সুবিধার্থে আমরা দিন-রাত জেনারেটর চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু একটানা জেনারেটর চালানোর কারণে জ্বালানি তেল বা ডিজেল বাবদ আমাদের খরচ ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে গেছে। অনেক হোটেলের জেনারেটর অতিরিক্ত লোড নিতে না পেরে বিকল হয়ে পড়ছে।’ 

তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের ধরে রাখতে আমরা হোটেল রুমের ভাড়ার ওপর ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড় দিয়েছি। কিন্তু এই প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ছাড় দিয়ে তো পর্যটকদের রাখা যায় না। অনেকেই বুকিং বাতিল করছেন, আবার যারা আছেন তারাও মাঝপথেই হোটেল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটনশিল্পে কোটি কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা সরকারের কাছে পর্যটন জোনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘কক্সবাজারে আজকের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে জলীয় বাষ্প-এর পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ। আগামীকাল থেকে মেঘের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং বৃষ্টির ঘনঘটাও থাকবে।’

কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী বাবুল মিঞা বলেন, ‘কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল জোনে প্রতিদিন প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও মিলছে ৪০ মেগাওয়াট। কলাতলী সাবস্টেশনের একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে যায়। ট্রান্সফরমারের ভেতরের কয়েলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটির মাধ্যমে আর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’