দুই মানুষের মুখে টিকে আছে যে ভাষা

বান্দরবানের আলীকদমে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে একটি ভাষা। রেংমিটচা ভাষায় এখন সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন মাত্র দুজন মানুষ। ভাষাটি বোঝেন বা টুকটাক বলতে পারেন আরও সাতজন। ভাষাবিদদের আশঙ্কা, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যেতে পারে এই ভাষা।

একসময় বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠীর ছয়জন মানুষ রেংমিটচা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। সময়ের সঙ্গে তাদের অনেকেই মারা গেছেন। শেষ পর্যন্ত একই পরিবারের তিন ভাই ছিলেন এই ভাষার সবচেয়ে দক্ষ বক্তা। চলতি বছরের ৫ মে তাদের একজন, ৬৬ বছর বয়সী মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যু হলে সেই সংখ্যাও কমে দাঁড়ায় দুজনে।

এখন তার দুই ভাই মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০) রেংমিটচা ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। সব মিলিয়ে ভাষাটি বোঝেন ও অল্প-স্বল্প বলতে পারেন এমন মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র নয়জন। বান্দরবানের কয়েকজন ভাষাবিদ বলছেন, রেংমিটচা ভাষা এখন বিলুপ্তির একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে যারা রেংমিটচা ভাষা জানেন, তারা সবাই ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাষাটি না বোঝায় তাদেরও দৈনন্দিন জীবনে ম্রো ভাষাতেই কথা বলতে হচ্ছে।

সবলীলভাবে কথা বলতে পারা দুই ভাই। বা‌মে রেংপুং ম্রো ও তার ভাই মাংপুং ম্রো

পরিবারের ভেতরে ভাষাটির ব্যবহার না থাকায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা আর ছড়িয়ে পড়ছে না। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে রেংমিটচা।

মাংওয়াই ম্রোর ভাইয়ের ছেলে সিংরা ম্রো বলেন, তিনি নিজেও ভাষাটি বোঝেন, তবে সাবলীলভাবে বলতে পারেন না। তার চাচা মাংওয়াই ম্রো মারা যাওয়ার পর এখন তার বাবা মাংপুং ম্রো এবং আরেক চাচা রেংপুং ম্রোই কেবল অনর্গল রেংমিটচা বলতে পারেন। তবে তারা দুজন এখন দুই পাড়ায় বসবাস করেন।

আলীকদম উপজেলার দুর্গম ক্রাংসিপাড়া ও মেনসিংপাড়ায় রেংমিটচা ভাষাভাষী এবং স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে রেংমিটচা অধ্যুষিত এলাকায় গুটিবসন্ত ও কলেরার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

মাংপুং ম্রো, সিংরা ম্রো ও কুনরাও ম্রো জানান, কয়েক বছর পরপর মহামারিতে বনসুপাড়া, কুইকিপাড়া, রানিপাড়াসহ কয়েকটি রেংমিটচা পাড়া প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বহু মানুষের মৃত্যু হয়। জনসংখ্যা এমনিতেই কম ছিল, মহামারিতে তা আরও দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়।

বান্দরবানে বিলুপ্তপ্রায় রেংমিটচা ভাষা জানা পাঁচজন

এরপর বেঁচে থাকা মানুষজন আশ্রয় নেন ম্রোভাষাভাষী পাড়াগুলোতে। ম্রোদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা ম্রো ভাষাভাষীদের সঙ্গে মিশে যান এবং একসময় ম্রো জাতিগোষ্ঠীর অংশ হয়ে ওঠেন।

আলীকদমের সাংবাদিক জিয়া উদ্দিন জুয়েল বলেন, ক্রাংসিপাড়াসহ কয়েকটি ছোট পাহাড়ি পাড়া গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে পার্বত্য অঞ্চলের অশান্ত পরিস্থিতিতে সেসব ছোট পাড়াও উচ্ছেদ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, পরে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা আবার একত্র হওয়ার চেষ্টা করলেও তা আর সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে তারা বড় ম্রো পাড়াগুলোতেই বসবাস শুরু করেন। ম্রোদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষার চর্চা হারিয়ে যায়। ভেঙে যায় ভাষাভিত্তিক পারিবারিক পরিবেশও। পরিবারের ভেতরে কথোপকথন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবাই ম্রো ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন।

বান্দরবানের ম্রো নেতা ও জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, একসময় গুটিবসন্তের নীরব মহামারিতে বহু রেংমিটচা ভাষাভাষী মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, উচ্ছেদ হয়েছিল তাদের পাড়াগুলো। পরে তারা ম্রো পরিবারগুলোর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।

খামলাই ম্রো বলেন, তার জানা মতে, এখনও কয়েকটি পরিবারের সদস্য রেংমিটচা ভাষায় অল্প-স্বল্প কথা বলতে পারেন। তবে যারা অনর্গল এই ভাষা বলতে পারেন, তাদের মাধ্যমেই ভাষাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই রেংমিটচা ভাষা পুরোপুরি অস্তিত্ব হারাবে।